বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ব্রাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন তফসিলের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। হলভিত্তিক ভোটার তালিকার অসঙ্গতি দূর না হওয়া পর্যন্ত তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। সেইসঙ্গে সঠিক তথ্য নথিপত্র প্রাপ্তির আগপর্যন্ত কমিশন কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন চালিয়ে যাবে না বলেও ঘোষণা দেয়।
এর মধ্য দিয়ে গত দুদিন ধরে মনোনয়ন ফরম নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে নির্বাচনি আমেজ ম্লান হয়ে গেছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এদিকে ভুল তথ্য সরবরাহকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনাসহ যথাসময়ে ব্রাকসু নির্বাচনের কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সকালের নির্বাচন উৎসব
মনোনয়ন ফরম বিতরণের দ্বিতীয় দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়ন সংগ্রহ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা স্লোগান ও মিছিল নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে তাদের কাঙ্খিত পদে নির্বাচনের জন্য ফরম সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মো. আশিকুর রহমান সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে তার মাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তার মায়ের সঙ্গে ডিপার্টমেন্ট ভবন-২ থেকে মিছিল বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এসে প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে তার ডিপার্টমেন্টের ও সমর্থনকারীরা স্লোগান দিতে থাকেন।
এ সময় তিনি বলেন, জুলাইয়ে সম্মুখ সারিতে আন্দোলনের স্মৃতির কথা বলেন। দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীর জন্য যেসব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন সেগুলো আদায় করতে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি নির্বাচিত হলে উন্নয়নমূলক কাজ করবেন বলে ব্যক্ত করেন।
নির্বাচনি ফরম সংগ্রহ করেন জুলাইয়ের আন্দোলনের সমন্বয়ক রোমানুল ইসলাম রাজ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর উন্নয়নে তাদের পাশে থেকে কাজ করবে।যেকোনো প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, আমার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র আরমান সাবেক সমন্বয়ক জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে নির্বাচন করবেন। তার সমর্থনে আমরা এসেছি, আমরা চাই তিনি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় উন্নয়নে সহায়ক হবেন। তাকে দিয়ে শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধান হবে।
ভুল ভোটার তালিকা নিয়ে প্রতিবাদ
হল সংসদের ভুলে ভরা ভোটার তালিকা নিয়ে ব্রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের একাংশ। মনোনয়নপত্র বিতরণের দ্বিতীয় দিন সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কার্যক্রমে যোগ দিলে তিনি তোপের মুখে পড়েন। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রুপম, মাসুদ রানা, স্বাধীন ইসলামসহ অন্যরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধিতে জোড়াতালি দিয়ে ব্রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে।
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী হামিদুর রহমানকে শহীদ ফেলানী হলের ভোটার করা হয়েছে। এমন ঘটনা অনেক রয়েছে। এছাড়া কিছু বিভাগের পরীক্ষা জানুয়ারি মাসে হলেও ব্রাকসু নির্বাচনের কারণে পাঁচ মাসের কোর্সকে তিন মাসে এনে তড়িঘড়ি করে ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর চাপে নির্বাচন, ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি, মনোনয়পত্রের চড়া দামসহ অনেক অসঙ্গতি রয়েছে ব্রাকসু নির্বাচনে। এ সময় শিক্ষার্থীদের দাবি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
তফসিলের কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা কমিশনের
মনোনয়পত্র বিতরণের শেষ দিনে ব্রাকসু নির্বাচনের তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত করেছে কমিশন। আজ সোমবার বিকেলে মনোনয়নপত্র বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. শাহজামান জানান, ব্রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ২৭ নভেম্বর মনোনয়ন বিতরণের কথা থাকলেও হলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের তালিকা পাওয়া নিয়ে জটিলতায় ফরম বিতরণ ৩০ নভেম্বর থেকে শুরু হয়। তফসিল কার্যকর করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর থেকে হলভিত্তিক সঠিক, হালনাগাদ ও ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোন হলের শিক্ষার্থী, কার কার ভর্তি বাতিল হয়েছে, কোন অপরাধের কারণে কোন ছাত্রের ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে এসব নির্ভুল তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনকে সরবরাহ করবে। এ সকল তথ্যের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সিদ্ধান্তের কোন সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে নির্বাচন কমিশন হলভিত্তিক ভোটার তালিকা চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করার পরও ওই দপ্তর যে ভোটার তালিকা ও হল সংযুক্তি সম্পর্কিত নথিপত্র দিয়েছে তাতে একাধিকবার গুরুতর অসঙ্গতি, ভুল তথ্য ও অসম্পূর্ণতা পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে মনোনয়নপত্র বিতরণ কার্যক্রম অব্যহত রাখা নির্বাচনি ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছতা ও গ্রহণয্যোগতার বিরুদ্ধে যাবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, আমরা মনে করি হলভিত্তিক ভুল ভোটার তালিকা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং এই তালিকার ভিত্তিতে মনোনয়নপত্র বিতরণ করলে প্রার্থীদের মধ্যে বৈধতা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হবে। ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা সংশোধন না করে নির্বাচন পরিচালনা কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। তাই হলভিত্তিক ভোটার তালিকার অসঙ্গতি দূর না হওয়া পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিতরণসহ তফসিলের অন্যান্য কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এ সময় নির্বাচনের কার্যক্রম কোনরূপে বিলম্ব ছাড়াই পুনরায় শুরু করতে ভোটার তালিকার সব ভুল, বাদ পড়া, দ্বৈততা, অসমাঞ্জস্য দ্রুত সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনের কাছে সরবরাহ করতে রেজিস্টার অফিসের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
ক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন বলেন, আজ সারাদিন ব্রাকসু নির্বাচন নিয়ে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। দিনের শেষে নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্ত দিলো, তা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। নির্বাচনের তফসিল একটি কাগজ কিংবা ডেডলাইন নয়। এটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি। আমরা কমিশন ও প্রশাসনের দ্বন্দ্ব দেখতে চাই না। নির্ধারিত তারিখে ব্রাকসু নির্বাচন দেখতে চায় শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী মো. আরমান বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বেরোবি প্রশাসন ও কমিশনের প্রতারণা মেনে নেওয়া হবে না। আমরা তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশ। আমরা অনশন করে ব্রাকসুর গেজেট পাস করিয়েছি। ব্রাকসু নির্বাচনের জন্য আমাদের হয়তো আবারও আন্দোলন করতে হবে।
যা বলছে প্রশাসন
নির্বাচন কমিশনকে ভুল তথ্য সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট রুমে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী সাংবাদিকদের জানান, আজ নির্বাচন কমিশন সাংবাদিক সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছে তা কমিশন ও প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর। নির্বাচন কমিশনের কাছে সরবরাহ করা ভোটার তালিকায় ভুল হওয়া অনাকাঙ্খিত ও আমরা লজ্জিত। এ ভুলের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। সেইসঙ্গে এর পেছনে কেউ জড়িত রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। কমিশন নির্বাচন স্থগিত করতে পারে না। আমরা দ্রুত সময়ে ত্রুটি সংশোধন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কাজ করছি।