আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে দশটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। তবে মনোনয়ন পাওয়া এই দশ আসনের ছয়টিতেই বঞ্চিতদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বঞ্চিতরা প্রতিদিনই এলাকায় ও মহাসড়কে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন থেকে শুরু করে মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। ইতোমধ্যে বেশির ভাগ বঞ্চিত প্রার্থী স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে প্রার্থী বদলের চিঠিও জমা দিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রার্থী বাছাইয়ে ঘোষিত নীতিমালা স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও মাঠের কর্মীদের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। দীর্ঘ ১৭ বছর দলের হয়ে আন্দোলন-সংগঠন, মামলা-নির্যাতন মোকাবিলা এবং এলাকায় জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও অনেকে মূল্যায়িত হননি। বঞ্চিতদের দাবি, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে দলের ভেতরে অসন্তোষ যেমন বাড়ছে, তেমনি আসন্ন নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও তারা মনে করছেন।
মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে এভাবে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ায় তৃণমূলে দ্বন্দ্ব বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। যেসব আসনে বিক্ষোভ সবচেয়ে তীব্র, সেখানে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করতে পর্যবেক্ষক টিম পাঠিয়েছে বিএনপি। এই টিম কেন্দ্রের কাছে প্রতিবেদন দেবে, যার ওপর ভিত্তি করে কিছু আসনে প্রার্থী পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রামে ঘোষণা করা ১০টি আসনের প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। এগুলো হলো, চট্টগ্রাম–১ (মিরসরাই) নুরুল আমিন চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) সরওয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড) কাজী সালাহউদ্দিন, চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম–৭ (রাঙ্গুনিয়া) হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম–৮ (বোয়ালখালী–চান্দগাঁও) এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম–১০ (খুলশী) আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) মোহাম্মদ এনামুল হক, চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলি) সরওয়ার জামাল নিজাম এবং চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। চট্টগ্রামের বাকি ৬টি আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি।
৩ নভেম্বর রাতে গুলশান কার্যালয় থেকে তালিকা ঘোষণার পরদিন থেকেই চট্টগ্রামের অর্ধেকের বেশি আসনে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মনোনয়ন না পাওয়ায় বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর সমর্থকরা প্রথমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, পরে রেলপথ অবরোধ করেন। এতে সীতাকুণ্ড স্টেশনে চট্টলা এক্সপ্রেসসহ দুটি ট্রেন আটকা পড়ে। আসলাম চৌধুরীর অনুসারীদের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, আন্দোলনে সক্রিয়তা ও ১১ বছরের কারাবাস সত্ত্বেও তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে।
আনোয়ারা-কর্ণফুলি ও মিরসরাই আসনে বিক্ষোভ ও মনোনয়ন-বাতিলের দাবি নিয়ে নেতাকর্মীদের মিছিল চলছে। কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ চিঠি পাঠানো, প্রতিটি পদক্ষেপই দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি তৃণমূলে অসন্তোষের প্রকাশ করছে।
মনোনয়ন বঞ্চিতদের বক্তব্য, বিএনপি যে মানদণ্ডের কথা বলে, ত্যাগ, গ্রহণযোগ্যতা, সংগঠনক্ষমতা সেসব বিবেচনা এই তালিকায় প্রতিফলিত হয়নি। আন্দোলনের কঠিন সময় যারা ঝুঁকি নিয়ে সামনে সারিতে ছিলেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। মনোনয়ন-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও পুনর্বিবেচনা জরুরি বলে দাবি তোলেন তারা। নির্বাচনে শক্ত অবস্থান নিতে হলে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে দলকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান বঞ্চিতরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব) মাহবুবের রহমান শামীমকে ফোন করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে পরে যোগাযোগের অনুরোধ করেন। তবে পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।