আজ ৬ ডিসেম্বর, লালমনিরহাট হানাদারমুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর কবল থেকে উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এই জেলাটি সম্পূর্ণ মুক্ত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের সদরদপ্তর ছিল লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীর হাসর উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে। এখান থেকেই উত্তর সীমান্তে গেরিলা অভিযান, প্রতিরোধ এবং মুক্তাঞ্চল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হতো।
রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী যুদ্ধাহত সাইফুল ইসলাম (৭৫) বলেন, লালমনিরহাটে উর্দুভাষী বিহারিদের বসতি ছিল বেশি। রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে তাদের অবস্থান ছিল শক্ত।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, পাকিস্তানি সেনারা বিহারিদের সহযোগিতায় খুব দ্রুতই স্থানীয় বাঙালিদের ওপর দমন–পীড়ন শুরু করে। বাঙালি নারীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে, যেখানে তাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি স্থানীয় রাজাকার-আলবদর সদস্যরা গ্রেফতার ও নির্যাতনে সরাসরি অংশ নেয়।
১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল হেলিকপ্টারযোগে পাকিস্তানি সেনারা লালমনিরহাট নামে। সেদিন লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিতে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ওসি শহীদ মীর মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বাঙালি পুলিশ ও সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করে। ফলে বহু পাকিস্তানি সেনা ও বিহারি নিহত হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দখলদার বাহিনী ৪ ও ৫ এপ্রিল লালমনিরহাটে ব্যাপক গণহত্যা চালায়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান হোসেন বলেন, ৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী রেলওয়ে হাসপাতালে হামলা চালায়। তখন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন গুলিবিদ্ধ ওসি মীর মোশাররফ হোসেন। হাসপাতালের শয্যাতেই তাকে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে চার চিকিৎসক, ডা. এ রহমান, ডা. এ মোকতাদির, ডা. এম রহমান ও ডা. এ জি আহমেদকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, উত্তর সীমান্তবর্তী হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে লালমনিরহাট এসে আশ্রয় নেন। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশকেই পাকিস্তানি বাহিনী ও সহযোগীরা হত্যা করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা চন্দ্রকান্ত বর্মণ জানান, ৬ নম্বর সেক্টর কমান্ডার এয়ার মার্শাল খাদেমুল বাশারের নির্দেশে আমরা ৩ ডিসেম্বর একযোগে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে পাকিস্তানি ঘাঁটিতে আক্রমণ শুরু করি। তীব্র প্রতিরোধে পাকিস্তানি সেনারা টিকতে পারেনি।
৫ ডিসেম্বর রাত থেকে ৬ ডিসেম্বর ভোরে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও বিহারিরা পালিয়ে যায়। পালানোর সময় তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা রেলওয়ে সেতুর একটি অংশে বোমা বিস্ফোরণ করে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত করে যায়।
৬ ডিসেম্বর সকালে লালমনিরহাটে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জেলা শহরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।