জুলাই গণঅভ্যুত্থান
২০২৪ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর নিউ মার্কেট ও নতুন রেলস্টেশন এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী যোগ দিলে হঠাৎ পরিস্থিতি রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সশস্ত্র হামলার শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ছাত্রদের ওপরে পুলিশও নির্বিচারে গুলি চালায়। আতঙ্কে ছত্রভঙ্গ হয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে থাকেন ছাত্ররা। এ সময় অন্তত পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী আশ্রয় নেন প্যারামাউন্ট সিটি কমপ্লেক্সের ওপরে অবস্থিত বাইতুল ফালাহ মসজিদে।
সেদিন গোলাগুলির মুখে দিশেহারা শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে সামনে আসেন মসজিদের খাদেম শহিদ মোহাম্মদ শফিক, যিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে মসজিদের সেবায় আছেন। তিনি তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তায় মসজিদের লাইট, ফ্যান, জানালা বন্ধ করে দেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদে লুকিয়ে রাখেন এবং মার্কেটের নিচতলার প্রধান গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন। তার সাহসী অবস্থানের কারণেই সেদিনের ভয়াবহ হামলার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা অন্তত ৬ ঘণ্টা নিরাপদে ছিলেন। সন্ত্রাসীরা একাধিকবার গেট ভাঙার চেষ্টা করলেও তিনি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
শহিদ মোহাম্মদ শফিক বলেন, ‘৪ জুলাই ছিল এক ঐতিহাসিক ও রক্তাক্ত দিন। চারদিকে রণক্ষেত্রের পরিবেশ, ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি। আল্লাহর রহমত আর সবার সহযোগিতায় আমরা অনেকগুলো প্রাণ বাঁচাতে পেরেছি।’ তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারসহ চট্টগ্রামেই বসবাস করছেন। এবং ৩৪ বছর ধরে মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ওইদিন গুলিতে আহত হন মার্কেটের দোকানকর্মী মো. ইলিয়াস ও বোরহান উদ্দিন। গুলিবিদ্ধ মো. ইলিয়াস জানান, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সিটি কলেজ ও রেলস্টেশনের দিক থেকে গুলি শুরু হয়। একটি গুলি এসে চোখের নিচে লাগে। পরে মসজিদের পাশে এক চিকিৎসকের চেম্বারে আশ্রয় নেই। দুই মাস ১৪ দিন পর অস্ত্রোপচারে গুলি বের করা হয়।’ উভয়ই বর্তমানে সুস্থ এবং পুনরায় কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন।
মার্কেটে তাণ্ডব-লুটপাট
প্যারামাউন্ট সিটি ও পার্শ্ববর্তী মহিউদ্দিন মার্কেটের বিভিন্ন দোকান ও গ্লাস শো-কেসে শতাধিক গুলির চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান। মার্কেটের নিচ তলায় বেশ কিছু দোকানের হামলা ও লুটপাট চালায় হামলাকারীরা। এই বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, ‘দোকানে ঢুকে লুটপাট করা হয় এবং অন্তত ২০ লাখ বেশি মালামাল ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।’
দোকান কর্মচারী রাশেদ বলেন, ‘ওই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। ছাত্রদের বাঁচাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। মসজিদে আশ্রয় না নিলে ভয়াবহ প্রাণহানি হতে পারত। মার্কেটের সবাই ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। যে ক্ষতি হয়েছে, তা নিজেরাই সামলে নিয়েছি। সরকারের পতন, এইটাই আমাদের কাছে বড় প্রাপ্তি।’
প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্র মোহাম্মদ সাজারুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী ও পুলিশের গুলিতে আমরা পালাতে থাকি। হঠাৎ রাস্তার পাশ থেকে ইট-পাটকেল ছুঁড়তে শুরু হয়। আমরা প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী নিরাপত্তার জন্য ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ি। মার্কেটের মানুষ গেট বন্ধ করে দেন।’
তিনি আরও জানান, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ফজলুল হক সিদ্দিকী তার লোকজন নিয়ে গেটে এসে চিৎকার করেন, ‘এটার ভেতরে ছাত্ররা আছে, সবাইকে এখানেই কবর দিতে হবে’। এরপর তারা গেট ভেঙে ফেলে, মার্কেটের লোকজন বাধা দিলে তাদেরও মারধর করা হয় এবং দোকানগুলো লুট করা হয়। পরে পুলিশ মার্কেটের গলি দিয়ে ঢুকে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।
প্যারামাউন্ট সিটি ও মহিউদ্দিন মার্কেটের মালিক অধ্যক্ষ ডা. আবদুল করিম বলেন, ‘দিনটি ভয়ংকর ছিল। আন্দোলনকারীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে আমার মার্কেটে ঢুকে পড়ে। এরপর তাদের দিকে গুলি, ইট-পাথর নিক্ষেপ করা হয়। দোকান, হোটেল, ব্যাংকের দরজা-জানালা ভেঙে যায়। পরে কিছু লোক দোকানের ক্যাশ লুট করে। মার্কেটে অন্তত ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’