লালমনিরহাটের জনসাধারণের ভোটের ভাবনা
রংপুর বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা লালমনিরহাট। এটি বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী ও তিস্তা নদী তীরবর্তী একটি জেলা। এ জেলায় ৫টি উপজেলা, ২টি পৌরসভা ও ৪৫টি ইউনিয়ন রয়েছে। সর্বমোট ৩টি আসন নিয়ে এ জেলা গঠিত।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৬২ হাজার ৬২৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৫২২ জন, নারী ভোটার পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ১০৬ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন আটজন। জেলায় ৩৮৫টি ভোটকেন্দ্রের দুই হাজার ১৯৩টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে লালমনিরহাটে বইছে ভোটের হাওয়া। চায়ের দোকান থেকে হাট বাজারে ভোটের আলোচনা। দিনরাত একাকার করে প্রার্থীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ভোটাররা বলছেন, শুধু দলীয় পরিচয় নয়, বরং প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সততা ও অতীত কর্মকাণ্ড দেখে আমরা এবার ভোট দেব। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের নিশ্চয়তা, জেলায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, যানজট দূর করে জেলায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধি এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করলে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সচেতন নাগরিক সমাজ তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। সবাই আশা করছে একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের।
লালমনিরহাট-১ আসন
হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-১ আসনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৯১ হাজার ৬২২ জন।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মোহাম্মদ হাসান রাজিব প্রধান। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মু. আনোয়ারুল ইসলাম রাজু (৪৮) প্রচারণা চালাচ্ছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হিসেবে শেখ মোহাম্মদ শাহ মঈনউদ্দিন রুবেল (৩০) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। সুযোগ পেলে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এম জি মোস্তফা (৬১) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
লালমনিরহাট-২ আসন
কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ২১ হাজার ৯৯১ জন। সারাদেশে প্রার্থী ঘোষণা করলেও এ আসনটি ফাঁকা রেখেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। তবে দলটির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ২ জন মাঠে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রোকন উদ্দিন বাবুল (৫৭) ও মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (৪৯) প্রচারণা চালাচ্ছেন। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ফিরোজ হায়দার লাভলু (৪৩) প্রচারণা চালাচ্ছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হিসেবে মো. রাসেল আহম্মেদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
লালমনিরহাট-৩ আসন
আসনটি সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত। লালমনিরহাট সদর আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৪৯ হাজার ৫৩৬ জন।
আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন আসাদুল হাবিব দুলু। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মো. আবু তাহের প্রচারণা চালাচ্ছেন। সুযোগ পেলে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মো. জাহিদ হাসান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
আসন্ন নির্বাচনে ভোটাররা ক্লিন ইমেজ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী দেখে ভোট দিতে চান। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা আদর্শ কলেজ শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণে সাধারণ জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যের ভয়ে অনেকে ন্যায়বিচার চাইতেও সাহস পাচ্ছেন না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে জননিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে।
সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নুরুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার আদর্শ ছিল সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আজ কিছু ব্যক্তির স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ডে সেই আদর্শ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে আখ্যা দেন এবং প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
প্রবীণ নুরুল হক (নজির নামক এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা) বলেন, রাজনীতিতে আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রতিহিংসা প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে সমাজে ভয়, বিভাজন ও হতাশা বাড়ছে। তিনি সামাজিক ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানান।
ভোটারদের প্রত্যাশা ও বিশ্লেষণ
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর কাজ ও গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উন্নয়নমুখী ও সৎ নেতৃত্ব চাই।
গৃহিণী রাহেলা বেগম অভিযোগ করে বলেন, “দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছে।” তরুণ ভোটাররা বলেন, “কর্মসংস্থান না হলে তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।