ভ্যাক্সিন হিরো খ্যাত স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতীতে মুখ থুবড়ে পড়েছে নবজাতকসহ শিশুদের ১০টি রোগ প্রতিরোধের টিকাদান কার্যক্রম। টানা এক মাসের কর্মবিরতীতে টিকা বঞ্চিত হচ্ছে দেশের লাখো শিশু।
জানা গেছে, পোলিও, হুপিং কাশি, যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকার, হাম, ডিপথেরিয়া, রুবেলাসহ ১০টি মারাত্বক রোগ প্রতিরোধে জন্মের পর থেকে ১৮ মাস বয়সে নির্ধারীত সময়ে ১১টি ভ্যাক্সিন প্রদান করতে হয়। বাংলাদেশ থেকে এ ১০টি রোগ নির্মুল করতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এ ভ্যাক্সিন প্রদান করছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
ইপিআই সম্প্রাসারিত টিকা দান কর্মসুচির মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছেন স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকরা। এ জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ২৪টি টিকাদান কেন্দ্র রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে উপজেলা প্রতি ৫/৬ শত জন শিশু এসব কেন্দ্রে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন পেয়ে থাকে। এজন্য শিশু জন্মের পরেই টিকা কার্ড প্রদান করা হয় এবং কার্ডেই উল্লেখ থাকে কবে কবে টিকা পাবে শিশুরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ভ্যাক্সিন নিতে হয়। ভ্যাক্সিন টিকা কার্ড ছাড়া মিলে না শিশুর জন্ম নিবন্ধন সনদ। ফলে জন্মনিবন্ধনেও ভাটা পড়েছে।
ইপিআই কার্যক্রম সফল হওয়ায় একাধিবার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পুরুস্কারও গ্রহণ করে সরকার। এ পুরুস্কার প্রাপ্তির পরে ভ্যাক্সিন হিরো হিসেবেও বেশ আলোচনায় আসেন ইপিআই কর্মসূচির মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নকারী স্বাস্থ্য সহকারীরা। আন্তর্জাতিক পুরুস্কার প্রাপ্তির সেই কার্যক্রম আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে হিরোদের কর্মবিরতীর মত কর্মসূচিতে। ফলে আগামীতে বাংলাদেশে এমন মারাত্বক ১০টি রোগের প্রার্দুভাব বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন সচেতন মহল।
ইপিআই সম্প্রসারণ কর্মসূচির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা উচ্চতর বেতন স্কেলের দাবিতে সারা দেশের মত লালমনিরহাট জেলায় কর্মবিরতী শুরু করেন গত ২৯ নভেম্বর থেকে। তাদের কর্মসূচি দীর্ঘ এক মাস ধরে চলমান থাকায় বন্ধ রয়েছে টিকাদান কার্যক্রম। তাদের কর্মবিরতীতে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষের কোন মাথা ব্যাথা নেই।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচার বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, জন্মের পরপরই শিশুকে ভ্যাক্সিন দিতে হয়। এক মাস ধরে টিকাদান কেন্দ্র বন্ধ থাকায় আমার শিশু ভ্যাক্সিন নিতে পারেনি। আমি এটা নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি। স্বাস্থ্য সহকারীরা এক মাস ধরে কর্মবিরতী পালন করছে। তাদের দ্রুত মাঠে কার্যক্রম শুরু করতে নীতিনির্ধারনী পর্যায় থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। না হলে শিশুরা টিকা পাবেনা।
বাংলাদেশ হেলথ এসিস্ট্যান্ট এ্যাসোসিয়েশনের লালমনিরহাটের সাবেক সভাপতি সোহেল মাসুদ বলেন, একই যোগ্যতার উপ সহকারী ভূমি কর্মকর্তারা ১৮তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। অথচ আমরা ভ্যাক্সিন হিরোরা আজও ১৮তম গ্রেডে রয়েছি। আমাদের পরিশ্রমে দেশ আন্তর্জাতিক পুরুস্কার পেলেও আমরা অন্ধকারেই রয়েছি।
সংগঠনটির সহ-সভাপতি হালিমা আক্তার বলেন, আমরা রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে শিশুদের সুরক্ষায় মাঠ পর্যায়ে কাজ করে আসছি। অথচ আমাদের যথাযথ মুল্যায়ন করা হচ্ছে না। একই যোগ্যতা নিয়ে অনেক দপ্তর উচ্চতর বেতন ভাতা ভোগ করছেন। আর আমরা বঞ্চিত। সরকার আমাদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন করছে না।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতীর কারণে গোটা দেশে এক মাস ধরে ইপিআই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে শিশুরা মারাত্বক ১০টি রোগের ১১টি ভ্যাক্সিন থেকে বঞ্চিত রয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ এ টিকাদান কার্যক্রম সচল করতে ঊর্দ্ধতন মহলের নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
লালমনিরহাট সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল হাকিম বলেন, ইপিআই কর্মসূচির কর্মীরা সারাদেশে উচ্চতর গ্রেডের জন্য কর্মবিরতী পালন করছে। বিষয়টি ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। এ নিয়ে সভাও করা হয়েছে। তাদের কর্মবিরতী দীর্ঘ সময় হলে শিশুদের সুরক্ষায় খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।