দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জয়পুরহাট ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার ফার্মেসিগুলোতে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না । ফলে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হওয়া রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ভ্যাকসিন সময়মতো না পাওয়ায় তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে রোগীরা অন্য জেলায় গিয়ে ভ্যাকসিন খুঁজছেন, যা তাদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ ও মানসিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোগীদের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে কুকুর ও বিড়ালের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। রাস্তাঘাটে চলাচল করলেই কুকুর-বিড়াল মানুষ ও গবাদি পশুর ওপর আক্রমণ করছে। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা ভ্যাকসিনের জন্য হাসপাতালে গেলে জানতে পারছেন ভ্যাকসিন মজুত নেই। অথচ কিছুদিন আগেও হাসপাতালে নিয়মিত ভ্যাকসিনের সব ডোজ দেওয়া হতো। যা বর্তমানে বন্ধ করে দিয়েছে।
ফলে প্রতিদিন অনেক রোগী হাসপাতালে এসে ভ্যাকসিন না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে জেলার ফার্মেসিগুলোতেও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন। দোকানিরা জানাচ্ছেন, ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও হাতে গোনা এক দুইটি দোকানে ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দাম নেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, সরবরাহ বন্ধ থাকলে আমাদের করার কি আছে? যতদিন সরবরাহ ছিল, ততদিন ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানির প্রতিনিধিরা বলছেন, ফ্যাক্টারিতে ভ্যাকসিনের কাঁচামাল না থাকায় আপাতত সরবরাহ বন্ধ আছে। তবে, খুব দ্রুত সরবরাহ করা হবে।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জেলার বিভিন্ন ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৫ ডিসেম্বর থেকে সরকারিভাবে হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আগে বিভিন্ন পৌরসভায় ভ্যাকসিন দেওয়া হতো, এখন সেটাও বন্ধ করা হয়েছে। এ অবস্থায় চিকিৎসকরা আক্রমণের তারিখ উল্লেখ করে বিভিন্ন কোম্পানির ভ্যাকসিনের নাম লিখে ছাড়পত্র হাতে ধরে দিয়ে ফার্মেসি থেকে কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন। রোগীরা জীবন রক্ষা করতে এক ফার্মেসি থেকে আরেক ফার্মেসিতে ছুটোছুটি করছেন। তবে, দুই একটি ফার্মেসিতে পাওয়া গেলেও সুযোগ বুঝে তারা চড়া দামে বিক্রি করছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সরকারিভাবে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সংকট নিরসনে বারবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠিয়েও ভ্যাকসিন পাওয়া যায়নি। অক্টাবরে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের যা চাহিদা ছিল নভেম্বর ও ডিসেম্বরে চাহিদা দ্বিগুন হয়েছে। বিশেষ করে ১৫ ডিসেম্বরের পর থেকে জলাতঙ্ক রোগীর পরিমাণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে ডিসেম্বর মাসের ভ্যাকসিন এখনও হাসপাতালে পৌঁছায়নি। এজন্য রোগীদের বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনে পুশ করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার হিচমি গ্রামের মো. আল-আমিন বলেন, প্রথম ডোজের ভ্যাকসিন জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালে না পেয়ে অনেক কষ্টে একটি ফার্মেসির দোকান থেকে ৯০০ টাকায় সংগ্রহ করতে হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে দ্বিতীয় ডোজ ভ্যাকসিন নিতে গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, হাসপাতালে ভ্যাকসিন নেই।
জেলার আক্কেলপুর উপজেলা থেকে আসা রোগী বেলাল হোসেন (৪০) বলেন, বাজারে যাওয়ার সময় রাস্তায় কুকুর আঁচড় দেয়। সকালে সদর হাসপাতালে আসি। এখানে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নাই। চিকিৎসকরা জানান বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনে পুশ করতে।
শনিবার রাতে কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে কালাই পৌরশহরের আঁওড়া মহল্লার বাসিন্দা আলাল হোসেন (২৮) বলেন, রোববার সকালে ভ্যাকসিন দিতে জয়পুরহাট জেনারল হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন পাইনি। চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন দিয়ে বলে ফার্মেসি থেকে কিনে নিতে। পুরো জয়পুরহাট জুড়ে কোন ফার্মেসিতে ভ্যাকসিন পাইনি। বাধ্য হয়ে বগুড়া থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেছি।
জয়পুরহাট শহরের সওদাগর ফার্মসির স্বত্বাধিকারী বাবু সওদাগর বলেন, কোনো কোম্পানিরই ভ্যাকসিন সাপ্লাই নাই। যাদের কাছে আছে, তারা হয়তো বেশি দামে বিক্রি করছেন। এ বিষয়ে আমার জানা নেই।
পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের জয়পুরহাট প্রতিনিধি (সেলস প্রমোশন অফিসার) জাহিদ হোসেন জানান, ফার্মেসিগুলোতে ভ্যাকসিনের ব্যাপক চাহিদা ও অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে। তবে ডিপোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় ভ্যাকসিন সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কাঁচামালের সংকটের কারণে এ ভ্যাকসিনের সংকট তৈরি হয়েছে।
জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা জেনারল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, এখন হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এমনকি রোগীর চাপ সামলাতে একটি ভ্যাকসিন
চারজনকও ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়েছে। সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাহির থেকে সংগ্রহ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগাযাগ করেছি। তারা আশ্বস্ত করেছেন, খুব দ্রুত ভ্যাকসিনের সংকট নিরসন করবেন।
জয়পুরহাট সিভিল সার্জন ডা. মো. আল-মামুন বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে কোনো ভ্যাকসিন মজুত নেই। তবে মজুত থাকাকালে প্রতিদিন গড়ে ২৫০-৩০০ জন রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হতো। এদের মধ্যে অধিকাংশ রোগীই প্রশাসন পরিবারের। তাদের পোষ্য প্রাণীর আচঁড় লাগায় ভ্যাকসিন নিতে হাসপাতালে আসতেন। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বলা হয়েছে, যারা পোষ্য প্রাণী পালন করেন, তারা নিজ উদ্যোগে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে রাখবেন। এ কারণে প্রকৃত রোগীরা প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন পাচ্ছেন না।
তিনি আরও বলেন, আশা করা যাচ্ছে দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকারি ভাবে হাসপাতালে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে ও রোগীদের দেওয়া যাবে।