মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চর বাউশিয়া বড়কান্দি গ্রামে শিল্পকারখানা স্থাপনের নামে সরকারের অনুমতি ছাড়াই ফসলি জমি বালু দিয়ে ভরাট করছে ‘সাহারা ট্রেডিং লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, এমন অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যেসব কৃষক প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি বিক্রি করতে রাজি নন, তাদের জমিতেও জোরপূর্বক বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে একাধিক পরিবেশবাদী সংগঠন।
তারা জানান, প্রভাবশালী একটি চক্রের সহযোগিতায় কোম্পানিটি প্রশাসনের নাকের ডগায় কৃষিজমি ভরাট করে চলেছে। নদীর জায়গা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও জোরপূর্বক ভরাট করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গজারিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে উপজেলায় ফসলি কৃষিজমির পরিমাণ প্রায় ৫০০ হেক্টর কমেছে। তবে প্রান্তিক কৃষকদের দাবি, বাস্তবের চিত্র আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, গত এক যুগে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে শিল্পকারখানা স্থাপন করা হয়েছে।
সরেজমিনে শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুপুরে চর বাউশিয়া বড়কান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমির পাশে ড্রেজার দিয়ে উঁচু করে বালু ভরাট করা হচ্ছে। এতে আশপাশের নিচু জমিতে পানি জমে কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও নতুন করে ফসলি জমি ভরাটের উদ্দেশ্যে জমির ভেতরে কংক্রিটের পিলার স্থাপন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী কৃষকেরা জানান, এসব জমিতে আগে ধান ও বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হতো। কিন্তু পাশের জমি ভরাটের কারণে বালু ও পানি জমে থাকায় এখন চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। কোম্পানিটি যেসব জমি ক্রয় করেনি, সেসব জমিও কার্যত অনাবাদি হয়ে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যেন তারা বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করে দেন।
স্থানীয় কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, এই জমিই ছিল আমাদের সংসারের একমাত্র ভরসা। কোম্পানি জমি ভরাট করে আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। চারদিক দিয়ে বালু ফেলে আমাদের ঘিরে ফেলেছে। এমন অবস্থায় তাদের কাছে জমি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, আমরা আমাদের জমি বিক্রি করিনি। পাশের জমিটি কোম্পানি কিনে বালু ফেলার কারণে আমাদের জমির প্রায় অর্ধেক বালুতে ভরে গেছে। আমরা কার কাছে যাব, কোথায় এর প্রতিকার পাব?
এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য জানতে বালু ভরাটের সাইটে গেলে সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি নিজেকে কোম্পানির কর্মকর্তা পরিচয় দেন। নাম ও পদবি প্রকাশ না করে তিনি বলেন, সরকারের অনুমতি নিয়ে ও যথাযথ নিয়ম মেনেই এখানে বালু ভরাট করা হচ্ছে। আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
নদী, খাল ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক শফিক ঢালী বলেন, গত এক দশকে গজারিয়ায় কৃষিজমি কয়েক হাজার হেক্টরেরও বেশি কমেছে। ফসলি জমি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এসব জমি নষ্ট হলে শুধু কৃষক নয়, পুরো দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে আমরা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করি।
এ বিষয়ে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। সরকারের অনুমতি ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক কারও জমি দখল করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।