সুন্দরবনে শিকারিদের মৃত্যুফাঁদ
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতির সর্বোচ্চ প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার আজ নিজ আবাসভূমিতেই চরম হুমকির মুখে। মানুষের পাতা অবৈধ শিকারের মৃত্যুফাঁদ এখন এই ম্যানগ্রোভ বনকে বাঘসহ নানা বন্যপ্রাণীর জন্য বিপজ্জনক করে তুলেছে।
গেল রোববার দুপুরে হরিণ শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়া একটি প্রাপ্তবয়স্ক রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে ট্রানকুইলাইজার গান ব্যবহার করে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। এর আগে শনিবার দুপুরে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্ধমারী এলাকার শরকির খালে বাঘটি ফাঁদে আটকা পড়ে।
উদ্ধারের পর অসুস্থ ও আহত বাঘটিকে লোহার খাঁচায় করে খুলনায় বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে বাঘটির ভবিষ্যৎ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মৃত্যুফাঁদে বিপন্ন সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে সুন্দরবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বন বিভাগের নজরদারি ও অবৈধ শিকার নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে। শিকারিরা সাধারণত হরিণের চলাচলের পথেই এসব ফাঁদ পেতে থাকে। খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো বাঘ এসব ফাঁদে আটকে মারাত্মকভাবে আহত হয়।
শুধু বাঘ নয়, শিকারিদের পাতা ফাঁদে বানর, বন্য শুকরসহ বিভিন্ন প্রাণী নিয়মিত আটকে পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্ধার সম্ভব হলেও অনেক সময় এসব প্রাণী ফাঁদেই প্রাণ হারাচ্ছে। বাঘ উদ্ধার হলেও সুন্দরবনে মৃত্যুফাঁদের ভয় থেকেই যাচ্ছে।

চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, গত রোববার দুপুর ৩টার দিকে ট্রানকুইলাইজার গান দিয়ে ইনজেকশন পুশ করে বাঘটিকে অচেতন করা হয়। পরে ফাঁদ কেটে উদ্ধার করা হয়। বাঘটির সামনের পায়ে ফাঁদ লেগে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। উৎসুক জনতার ভিড় এড়াতে দ্রুত খাঁচায় করে খুলনায় পাঠানো হয়।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও বন বিভাগ নিয়মিত টহল ও অভিযান চালাচ্ছে। শিকার প্রতিরোধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জেলে ও মৌয়ালদের সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদ পেলে তা উদ্ধার করে বন বিভাগে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতি কেজি ফাঁদের জন্য দুই হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি চরদুয়ানী ও জ্ঞানপাড়া এলাকায় স্থানীয়দের নিয়ে দুটি ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে।
সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগের নজরে আসায় একটি বাঘ রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—হাজার হাজার মৃত্যুফাঁদ তো এখনও সুন্দরবনে ছড়িয়ে আছে। এসব ফাঁদে বাঘ, হরিণ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী যে মারা যাচ্ছে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
তিনি বলেন, সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। র্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। শুধু উদ্ধার অভিযান নয়, অবৈধ শিকার বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নিয়মিত টহল, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া সুন্দরবনের বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, চরদুয়ানী, জ্ঞানপাড়া, জয়মনি, বৌদ্ধমারী, কচুবনিয়া, ধানসাগর, কবরখালী, মানিকখালী, কচিখালী, বগি ও চরখালি এলাকায় শিকারিদের তৎপরতা বেশি। এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বনসংলগ্ন লোকালয়ের শিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষা অনেকটাই সম্ভব হবে।