দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রথম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউজে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক হাজার ১৩ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় রাজস্ব আদায়ে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি বাণিজ্যের স্থবিরতা, ভারত- বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বন্দরের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম মিলেই এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমস হাউজের জন্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। তবে, বাস্তবে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১২০ দশমিক ০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ১৩ কোটি টাকা। গত এক দশকের মধ্যে বেনাপোল কাস্টমসে এত বড় ছয় মাসের ঘাটতি বিরল বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
মাসভিত্তিক হিসাবেও রাজস্ব পতনের চিত্র স্পষ্ট। জুলাই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আদায় হলেও আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘাটতি বাড়তে থাকে। আগস্টে ৪৯৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৪৪৭ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে ৬০১ কোটির বিপরীতে আদায় হয় ৫১৩ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা।
অক্টোবরে ৬৪৫ কোটির বিপরীতে আদায় হয় মাত্র ৪৪৯ দশমিক ২৮ কোটি টাকা। নভেম্বরে ৭৫৫ কোটির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৫৬৪ দশমিক ৪১ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বরে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬শ দশমিক ৮১ কোটি টাকা, যা সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে। আগে যেখানে বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫শ থেকে সাড়ে ৫শ পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করত, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ ট্রাকে। ট্রাক চলাচল কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমদানির পরিমাণ ও রাজস্ব আদায়ও কমেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোল দিয়ে আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন পণ্য। অথচ আগের অর্থবছরে একই সময়ে এবং পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছর মিলিয়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪২০ মেট্রিক টনের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বাণিজ্যে বড় ধরনের পতন ঘটেছে, যা বেনাপোল বন্দরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় ধস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য আমদানিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। শিল্প কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, যন্ত্রাংশ ও কেমিক্যাল আমদানি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এসব পণ্য থেকেই কাস্টমস শুল্ক ও ভ্যাটের বড় অংশ আসে। ফলে এসব পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই দায়ী নয়। কাস্টমস ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও আমদানিকারকদের বেনাপোলমুখী আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক লতা বলেন, কাস্টমসের নিচের স্তরের কিছু কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা না মেনে পণ্যের অতিমূল্যায়ন করছেন। এর সঙ্গে বন্দরের নানা অনিয়ম ও বিলম্ব যুক্ত হয়ে আমদানিকারকদের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য এখন অন্য বন্দর দিয়ে আমদানি হচ্ছে, আর বেনাপোলের রাজস্ব কমছে।
অপরদিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। বেনাপোল কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন বলেন, ‘প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে, এটা আমরা স্বীকার করছি। আমদানি বাণিজ্য কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। তবে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত পণ্য খালাস এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদারে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, অর্থবছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা হলেও উন্নতি হবে।’