মাত্র সাত মাসের জীবনে ছোট্ট বানর পাঞ্চের জীবনে অনেক কিছুই ঘটেছে। জন্মের পর মায়ের প্রত্যাখ্যান থেকে শুরু করে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝড় তোলা—কোনোকিছুই যেন বাদ নেই।
জাপানের ইচিকাওয়া চিড়িয়াখানার পাঞ্চকে নিয়ে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলো তার প্রজাতি জাপানিজ ম্যাকাক সম্পর্কে মানুষের মধ্যে প্রবল কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
মা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর চিড়িয়াখানার রক্ষকরা পাঞ্চকে একটি ওরাংওটাং-এর পুতুল দিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ বার ভিউ হওয়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পাঞ্চ পুতুলটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে, যখন অন্য বানররা তার প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ করছে অথবা তাকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলছে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এবং দর্শনার্থী—উভয় পক্ষই এই ভিডিওগুলো শেয়ার করেছেন।
পাঞ্চ যখন ইন্টারনেটে পরিচিতি পায়, তখন থেকে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তার খবর দিচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে, বাচ্চা বানরটি ধীরে ধীরে নিজের দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পথে এগোচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, পাঞ্চ ‘তার পুতুল ছাড়াই অন্য ছোট বানরদের সঙ্গে খেলাধুলা করেছে।’
পাঞ্চের মা কেন তাকে ত্যাগ করল
ভিয়েনার ইউনিভার্সিটি অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের গবেষক আন্তোনিও হোসে ওসুনা মাসকারো ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘এ ধরনের আচরণ মাঝেমধ্যে দেখা যায়; বিশেষ করে খাঁচাবন্দি অবস্থায়। মা অনভিজ্ঞ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে জাপানিজ ম্যাকাক তার সন্তানকে ত্যাগ করতে পারে।’
গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী হ্যারি হারলোর কুখ্যাত এক পরীক্ষার কথা এসময় উল্লেখ করেন মাসকারো।
সে পরীক্ষায় বানরদের সামাজিক সংস্পর্শহীন অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে বড় করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই বানররা যখন মা হয়, তারা তাদের সন্তানদের লালন-পালনে একেবারেই দক্ষ ছিল না।
পাঞ্চের ক্ষেত্রে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার জন্ম হয়েছিল প্রচণ্ড তাপদাহের সময় এবং তার মা তখন প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিল।
মা-বাবার অভাব প্রাইমেটের জীবনে কী প্রভাব ফেলে
জাপানিজ ম্যাকাকের মতো প্রাইমেটদের (মানুষ বা বানরসদৃশ প্রাণী) দল ছাগল বা হরিণের পালের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে কাজ করে।
বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ অনিন্দ্য সিনহা এর ব্যাখ্যায় বলেন, গবাদি পশুরা সাধারণত খাবার ও নিরাপত্তার জন্য একসঙ্গে থাকে। কিন্তু প্রাইমেটদের দলে নিজস্ব সামাজিক বন্ধন এবং কঠোর নিয়ম থাকে।
তিনি বলেন, ‘পাঞ্চ ওই দলের জন্য এক নতুন সদস্য। যেহেতু তার নিজের মা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই দলটির সঙ্গে মিশতে তার সময় লাগবে। দলের সামগ্রিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি খাবার নিয়ে প্রতিযোগিতা বা অন্য কোনো চাপ থাকে, তাহলে দল নতুন কাউকে সহজে মেনে নিতে চাইবে না।’
অনিন্দ্য সিনহা বলেন, ‘যেহেতু বানরগুলো চিড়িয়াখানায় বন্দি, তাই পাঞ্চের অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। দলটিকেও সবসময় তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ ছাড়া জাপানিজ ম্যাকাকদের মধ্যে অত্যন্ত কঠোর স্তরবিন্যাস কাজ করে, যেখানে প্রতিটি বানরের নির্দিষ্ট মর্যাদা থাকে এবং দল তাকে সেই অনুযায়ী মূল্যায়ন করে।’
বড় হওয়ার পর পাঞ্চ কি তার শৈশব মনে রাখবে
ওসুনা মাসকারো মনে করেন, রাখবে।
তিনি বলেন, ‘প্রাইমেটদের সামাজিক জীবন খুব জটিল এবং তাদের আচরণ শেখা ও সঠিক বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। অন্য যেকোনো সামাজিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো পাঞ্চেরও ইতিবাচক সান্নিধ্য ও স্পর্শ প্রয়োজন। যেহেতু সে তা পাচ্ছে না, তাই সেই অভাব পূরণ করতে সে পুতুলটিকে সবসময় সঙ্গে রাখছে।’
অন্য প্রাণীরাও কি পুতুলের প্রতি এমন টান অনুভব করে
অনিন্দ্য সিনহা জানান, যেসব প্রাণীর বাচ্চারা মায়ের পিঠে বা কোলে চড়ে বড় হয় না, তাদের ক্ষেত্রে পুতুলের প্রতি এমন টান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, ‘প্রাইমেটরা ছোটবেলায় মায়ের গায়ে লেগে থাকে। মানসিক প্রশান্তি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের শারীরিক স্পর্শ প্রয়োজন। সম্ভবত এই কারণে পাঞ্চ পুতুলটির সান্নিধ্য খুঁজছে। একটি ছাগল ছানার হয়তো পুতুল ছাগলের প্রয়োজনীয়তা এতটা হবে না।’