ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ট্রানজিট সুবিধা কেন্দ্রিক কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে প্রকল্পটির কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামো পাওয়া যায়নি। সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে কোথাও টার্মিনাল ভবন, যন্ত্রপাতি কিংবা নির্মাণকাজের চিহ্ন চোখে পড়েনি। নির্ধারিত এলাকা বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে; সেখানে এখন শুধুই গবাদিপশুর বিচরণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের পর ভারত সরকারের সঙ্গে ট্রানজিট ও করিডোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আশুগঞ্জ নদীবন্দর ও আখাউড়া স্থলবন্দর ব্যবহার করে আগরতলার পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারী যন্ত্রাংশ পরিবহনের অনুমতি দেয় বাংলাদেশ সরকার। এ ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের নৌ প্রটোকল চুক্তির আওতায় জল ও স্থলপথ ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে।
এই ট্রানজিট কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে আশুগঞ্জ বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয় এবং ২০১৩ সালে আশুগঞ্জ বন্দর থেকে প্রায় ৭০০ মিটার দক্ষিণে ৩৩ একর জমির ওপর প্রায় ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে কন্টেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের পরও প্রকল্প এলাকায় কোনো উন্নয়ন কার্যক্রমের ছাপ নেই। কোথাও ইট-পাথর বা স্থায়ী স্থাপনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অপরদিকে এই সরকারি প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের মধ্যে ২০% গেল ১৫ বছরেও ক্ষতিপূরণ পাননি। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করেছেন তারা।
ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তারা বলেন, জমির মূল্য প্রকৃত দামের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানো হয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য হয়েছে, প্রকৃত মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নকল দলিল ব্যবহার করে ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের জমির মালিকদের একজন কুদ্দুস মিয়া বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে তার নামে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি আদালতে মামলা করলেও দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি বলে জানান।
আরেক মালিক মোবারক হোসেন অভিযোগ করেন, নকল কাগজপত্রের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি তার প্রাপ্য অর্থ তুলে নিয়েছেন। তাদের মতে, অনেক প্রকৃত মালিক গত ১৪–১৫ বছর ধরে ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে ঘুরছেন।
ভূমি অধিগ্রহণ ও অর্থ ছাড় প্রক্রিয়ায় তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী একটি চক্র সক্রিয় ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে আশুগঞ্জ বন্দরের এই টার্মিনাল এলাকা পরিত্যক্ত ও বেদখলে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। স্থানীয়রা দাবি করছেন, ‘প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক এবং প্রকৃত জমির মালিকদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হোক। অথবা প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে অধিগ্রহণকৃত জমি মালিকদের ফেরত দেওয়া হোক।