বাংলা ভাষার আকাশ যখন দখলদারিত্বের কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল, তখন একদল তরুণ বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল ইতিহাসের মোড়ে। তাদের সামনের সারিতে ছিলেন অলি আহাদ—একটি নাম, একটি প্রতিবাদ, একটি উচ্চারণ। ভাষা তার কাছে কেবল বর্ণমালা নয়, বরং ছিল জাতির আত্মা, আত্মপরিচয়ের শপথ।
রুমিন ফারহানা, অলি আহাদের কন্যা। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার রাজনৈতিক জীবনের সাক্ষী। একসময় স্বচক্ষে দেখেছিলেন তার বাবা কিভাবে রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেছেন এবং সেইসাথে জনগণের অধিকার রক্ষায় এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। রুমিন ফারহানা, যিনি একজন ব্যারিস্টার ও বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য।
ছাত্রজীবনেই বিদ্রোহের বীজ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই তরুণ খুব অল্প বয়সেই বুঝে ফেলেছিলেন— রাজনীতি মানে ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার ময়দান। ঢাকা কলেজে পড়ার সময়ই তিনি নেতৃত্বে উঠে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ করা হয়। কিন্তু ইতিহাস জানে— যাদের পথ রুদ্ধ করা হয়, তারাই পথ তৈরি করেন।
ভাষার প্রশ্নে আপসহীন
পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন পূর্ব বাংলার হৃদয়ে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুনের শিখায় উচ্চারিত হয় অলি আহাদের কণ্ঠ— ‘বাংলা ভাষার প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না, এটা আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।’ ১৯৪৮ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ গঠনে তার অগ্রণী ভূমিকা ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক ভিত্তি দেয়। ১৯৪৯ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠন করেন। ধর্মঘট, মিছিল, গ্রেপ্তার— সবকিছুর মধ্যেও তার কণ্ঠ থামেনি।
১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে খাজা নাজিমউদ্দীন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে যখন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ নিয়ে দ্বিধা, তখন অলি আহাদ ছিলেন দৃঢ়— ‘পিছিয়ে গেলে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।’ ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তঝরা দিনে তিনি ছিলেন আন্দোলনের অগ্রসেনানী। তার পরামর্শেই ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার— রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতীক, এক শপথস্তম্ভ।
রুমিন ফারহানা, অলি আহাদের কন্যা। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার রাজনৈতিক জীবনের সাক্ষী। একসময় স্বচক্ষে দেখেছিলেন তার বাবা কিভাবে রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেছেন এবং সেইসঙ্গে জনগণের অধিকার রক্ষায় এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। রুমিন ফারহানা, যিনি একজন ব্যারিস্টার ও বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য।
ভাষা থেকে স্বাধীনতা
অলি আহাদ বিশ্বাস করতেন, ভাষা আন্দোলনই স্বাধীনতার প্রথম পদক্ষেপ। তার ভাষায়— ‘আমাদের আন্দোলন কেবল ভাষার নয়, এটি ছিল আত্মপরিচয়ের আন্দোলন।’ তিনি ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্নে একের পর এক সংগঠন গড়ে তুলেছেন— যুবলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, নাগরিক স্বাধীনতা লীগ। সামরিক শাসন, গ্রেপ্তার, নিষেধাজ্ঞা— কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থেকেও তিনি কলম থামাননি। বন্দিশালার অন্ধকারে বসেই লেখেন ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-’৭৫’-
যেখানে তিনি তুলে ধরেন এক উত্তাল সময়ের রাজনৈতিক অন্তরঙ্গ ইতিহাস।
আপসহীনতার মূল্য
স্বাধীনতার পরও তিনি ক্ষমতার মোহে ভেসে যাননি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নীতিহীনতার বিরুদ্ধে, যে সরকারেরই হোক— তিনি ছিলেন সরব। তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়, তিনি কারাবরণ করেন। কিন্তু নীরব হননি। রাজনীতি মানে জনগণের সেবা, ক্ষমতার লড়াই নয়-এই বিশ্বাসই ছিল তার রাজনৈতিক আদর্শের মেরুদণ্ড।
উত্তরাধিকার: রক্তমাখা অক্ষরের শপথ
২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয় তাকে। ধানমন্ডির একটি সড়ক তার নামে নামকরণ করা হয়। ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর তিনি বিদায় নেন- কিন্তু রেখে যান এক অগ্নিস্মৃতি। অলি আহাদের জীবন আমাদের শেখায়-ভাষা মানে কেবল শব্দ নয়, অস্তিত্বের ঘোষণা। যে জাতি নিজের ভাষাকে ভালোবাসে, সে জাতি মাথা নত করে না। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তিনি শুধু এক সংগঠক নন; তিনি এক অগ্নিসন্তান, এক উচ্চারণ- বাংলার প্রতিটি অক্ষরে যার প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায়।