দীর্ঘ ৩১ বছর পর বান্দরবান আসনে বিএনপির প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও গ্রুপিংয়ের কারণে হারিয়েছেন মন্ত্রিত্ব। স্থানীয় সুশীল সমাজ এবং বিএনপির কর্মী-সমর্থকেরা মনে করছেন নবনির্বাচিত স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহবায়ক রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী এবং জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক পৌরসভার মেয়র মো. জাবেদ রেজা দুই গ্রুপে বিভক্ত বিএনপির রাজনীতিতেই কপাল পুড়েছে বান্দরবানবাসীর। বিগত ১৭টি বছর আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথের লড়াকু সৈনিক মন্ত্রীত্বের যোগ্য দাবীদার হওয়ার পরও সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী'কে মন্ত্রীত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাচন অফিস ও রাজনীতিবিদদের তথ্যমতে, ১৯৯১ সালে বীর বাহাদুর উশৈসিং আওয়ামী লীগ থেকে প্রথমবার জয়ী হন। তব ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত বিএনপির মাম্যাচিং সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির সাচিং প্রু জেরি বিজয়ী হলেও ওই বছর জুনের পুনর্নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বীর বাহাদুর উশৈসিং পুনরায় জয়ী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মাম্যাচিং ৮৫৩ ভোটে পরাজিত হন আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের কাছে। তখন বিএনপির বিদ্রোহী হয়ে রাজপুত্র
সাচিংপ্রু জেরী ১৪ হাজার ভোট পান। বিদ্রোহী প্রার্থী না হলে তার প্রাপ্ত ১৪ হাজার ভোট মাম্যাচিংয়ের ভোটবাক্সে যুক্ত হয়ে বিএনপি নির্বাচিত হতো।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাচিংপ্রু জেরী ৫১ হাজার ৫৪০ ভোট পেয়ে আওয়ামীলীগের প্রার্থীর কাছে ১৯ হাজার ভোটে পরাজিত হয়। তখন বিএনপির একটি অংশ ভেতরে ভেতরে বিরোধিতা করেছে।
জুলাই বিপ্লবের পর সদ্য ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তবে গ্রুপিং পিছু ছাড়েনি বিএনপির৷ মতবিরোধ এবং বিভাজনে এবার মন্ত্রীত্ব থেকে বঞ্চিত হলো বান্দরবানবাসী। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার পরও কপাল পুড়েছে রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরীর।
অথচ ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুর উশৈসিং একটানা সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সতেরটি বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান (মন্ত্রীর পদমর্যাদায়), পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন বান্দরবান থেকে নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, বান্দরবান বিএনপি গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে আবদ্ধ। রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধে ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপিতে এ গ্রুপিং শুরু হয়। রাজপরিবারের সম্পর্কে ভাগ্নে রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী এবং মামি রাজ পুত্রবধূ মাম্যাচিং মাধ্যমের গ্রুপিংয়ের সূত্রপাত যা বর্তমানে জাবেদ-জেরী গ্রুপে পরিনত হয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলমান এ গ্রুপিং। কোনো সুখবর দেখছি না। মাম্যাচিং গ্রুপ এখন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক পৌরসভার মেয়র মো. জাবেদ রেজা গ্রুপে মাম্যাচিংসহ অন্তর্ভুক্ত। আর জেলা বিএনপির আহবায়ক রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী এর গ্রুপতো বিভক্ত রয়েছেই।
জেলা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক জসিম উদ্দিন তুষার (জাবেদ রেজা গ্রুপের) বলেন, ‘প্রত্যেকটি জেলার কর্মকাণ্ড বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের নজরদারিতে রয়েছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হয়। বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা ছিল মন্ত্রীত্ব পাওয়ার। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন পর সংসদ সদস্য পেলেও মন্ত্রীত্ব থেকে বঞ্চিত হলাম। হয়ত আমাদের সমষ্টিগত কোনো ভুল ছিল। তবে জেরী দাদা সঠিক আমাদের মূল্যায়ন না করলেও ধানের শীষের বিজয়ে জাবেদ রেজা ও মাম্যাচিংয়ের নেতৃত্বে আমরা প্রাণপণ কষ্ট করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি।’
জেলা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক (জেরী গ্রুপের) মুজিবুর রশীদ বলেন, ‘প্রত্যাশা ছিল মন্ত্রীত্বের। কিন্তু প্রথম দফায় বাদ পড়লেও যোগ্যতার ভিত্তিতেই বান্দরবান সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী মূল্যায়িত হবে, কেন্দ্র থেকে তেমনি আশ্বস্ত করা হয়েছে। যোগ্যতার বিচারেই বিজয়ীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। গ্রুপিং বা বিরোধিতায় মন্ত্রীত্ব পায়নি বিষয়টি তেমনটি নয়। আমরা এখনো আশাবাদী, দ্বিতীয় ধাপে হয়তো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।’
জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য সাবিকুর রহমান জুয়েল বলেন, ‘দলের মধ্যে মতবিরোধ-বিভাজন ছিল, আছে এবং থাকবে। এটি স্বাভাবিক বিষয় আমার মনে হচ্ছে। বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা ছিল পার্বত্য মন্ত্রীত্ব, কিন্তু বঞ্চিত হলাম। এটি গ্রুপিংয়ের জন্য বলাটা সমিচীন হবে না।’