রোগীদের চিকিৎসার টাকা কি আমোদ-প্রমোদে?
একটি আদর্শ ও আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা বরাদ্দ থাকার কথা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম, আইসিইউ, সিসিইউ কিংবা অত্যাধুনিক ল্যাবের জন্য। অথচ রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো! ছয় নবজাতকের করুণ মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক অভিযানে হাসপাতালটির ভেতরেই খুঁজে পাওয়া গেছে এক বিশাল বিলাসবহুল ‘সুইমিং পুল’! একদিকে ওটি-র ভেতর মাছি আর তেলাপোকার নোংরা রাজত্ব, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে হাসপাতালের ভেতরেই আমোদ-প্রমোদের এই সুইমিং পুল, সেবার আড়ালে আকিজ ও আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষের এমন চরম খামখেয়ালি ও জালিয়াতির অন্দরমহল নিয়ে নাগরিক প্রতিদিন-এর বিশেষ অনুসন্ধান।
কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতে, একটি হাসপাতালের যেকোনো ধরনের এক্সটেনশন বা নতুন কাঠামো তৈরি করতে হলে নির্দিষ্ট ‘মেডিক্যাল আর্কিটেকচারাল গাইডলাইন’ ও ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। কিন্তু আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ কোনো নকশা বা কাঠামোর তোয়াক্কা না করে, যেদিক দিয়ে পেরেছে সেদিকেই বাণিজ্যিক বেকারি আর বহুতল এক্সটেনশন বানিয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, হাসপাতালের মতো একটি অতি সংবেদনশীল ও জীবাণুমুক্ত জোনের ভেতরে এই বিশাল সুইমিং পুল তৈরি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুইমিং পুলের বিপুল পরিমাণ পানি জমিয়ে রাখা, তার রাসায়নিক বর্জ্য ও আর্দ্রতা হাসপাতালের বাতাসে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের সংক্রমণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা ওটি ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের রোগীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আকিজ গ্রুপ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জনস্বাস্থ্যের এই মৌলিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে এই সুইমিং পুলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।
হাসপাতালের কলেজ ভবনের আটতলায় এই সুইমিং পুলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে সুইমিং পুলের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে হাসপাতাল কতৃপক্ষ কথা বলতে রাজি হয়নি।
গত বুধবার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি অপারেটিভ ওয়ার্ডে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অভিযানে হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় যখন দুর্গন্ধযুক্ত পচা পানি ও মশার প্রজনন ক্ষেত্র পাওয়া গেছে, ঠিক তখনই এই সুইমিং পুলের পানির উৎস এবং এর বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, মানুষের যাকাত ও দানের টাকা ও গরিব রোগীদের চিকিৎসার পেছনে খরচ না করে, কার স্বার্থে এবং কার আমোদ-প্রমোদের জন্য হাসপাতালের ভেতরে এই বিলাসবহুল সুইমিং পুল বানানো হলো? এই পুল কি তবে আকিজ ও আদ্-দ্বীনের শীর্ষ কর্তাদের ব্যক্তিগত রিসোর্ট হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছিল?
রমনা থানায় অবহেলার মামলার পর হাসপাতালের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন পুলিশের কড়া নজরদারিতে রয়েছেন। আগামী ৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি এই কাঠামোগত ত্রুটি ও সুইমিং পুলের অবৈধ ডিজাইনের বিষয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করতে যাচ্ছে। সেবার আড়ালে মরণফাঁদ পেতে বসা এই চক্রের প্রতিটি হোতাকে আইনের মুখোমুখি দেখতে চায় দেশবাসী।