২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় আসামি হয়েও এখনো গ্রেপ্তার হননি রমনা গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. হুমায়ুন কবীর। বর্তমানে তিনি সিলেট রেঞ্জ অফিসে সংযুক্ত রয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপি নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের আটক, নির্যাতন এবং আন্দোলন দমনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় দায়ের করা একাধিক মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। কয়েকটি মামলার তদন্ত নথিতে তাকে পলাতক আসামি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একই মামলার অন্য আসামিরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও হুমায়ুন কবীর এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
দেশ ছাড়ার চেষ্টা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন হুমায়ুন কবীর। এরই মধ্যে গোপনে তার দুই সন্তানের পাসপোর্টের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সূত্র।
এর আগে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা এবং নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে উপস্থাপনেরও চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে দেশ ছাড়ার চেষ্টা, সন্তানদের পাসপোর্ট এবং রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টার অভিযোগের বিষয়ে হুমায়ুন কবীরের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
যেসব মামলায় আসামি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় হুমায়ুন কবীরের নাম রয়েছে।
রামপুরার মালিবাগ রেলগেট এলাকায় যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের ওপর হামলার ঘটনায় তার গাড়িচালকের স্ত্রী মোছা. সুমি বেগম রামপুরা থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। ওই মামলায় হুমায়ুন কবীরকে আসামি করা হয়েছে।
২০২২ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশি অভিযানের ঘটনায় বিএনপি নেতা মাহফুজুর রহমান পল্টন থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলাতেও আসামি করা হয় হুমায়ুন কবীরকে।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় গুলশান এলাকা থেকে এক শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনেও তাকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হানিফ ফ্লাইওভারের কাছে এক আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শাহবাগ থানায় দায়ের করা মামলাতেও ডিবির সাবেক এই ডিসিকে পলাতক আসামি করা হয়েছে।
জাহিদ হোসেন রাব্বি নামে এক আন্দোলনকারী গুলিতে নিহতের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলাতেও হুমায়ুন কবীরের নাম রয়েছে। খিলগাঁও থানার ওই মামলায় অন্য আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও তিনি এখনো গ্রেপ্তার হননি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় রমনা ডিবির দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা আন্দোলন দমনের বিভিন্ন অভিযানে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে হুমায়ুন কবীরসহ একাধিক কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
এরই মধ্যে একই মামলার কয়েকজন আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) জাবেদ ইকবাল প্রীতমও রয়েছেন। অথচ একই মামলার আসামি হুমায়ুন কবীর এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং সিলেট রেঞ্জ অফিসে সংযুক্ত রয়েছেন।
২০২২ সালের ৩১ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এক আদেশে হুমায়ুন কবীরকে রমনা গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়। দায়িত্ব পালনকালে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রায় দুই বছর রমনা বিভাগের দায়িত্ব পালনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএমপিতে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্থানে পদায়ন করা হয়। হুমায়ুন কবীরকে সংযুক্ত করা হয় সিলেট রেঞ্জ অফিসে।
চাঁনখারপুলের ঘটনায়ও একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার নাম
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় চাঁনখারপুল ও আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করা রমনা ও লালবাগ বিভাগের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার নাম বিভিন্ন হত্যা মামলার তদন্তে এসেছে।
তৎকালীন রমনা বিভাগে ডিসি (ক্রাইম) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মো. আশরাফুল ইসলাম। রমনা জোনাল টিমে এডিসি ছিলেন শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম এবং এসি ছিলেন মো. ইমরুল।
এ ছাড়া নিউমার্কেট জোনাল টিমে এডিসি হাফিজ আল আসাদ, এসি রেফাতুল ইসলাম এবং ধানমন্ডি জোনাল টিমে এডিসি মো. ইহসানুল ফিরদাউস দায়িত্বে ছিলেন। শাহবাগ থানার ওসি ছিলেন মোস্তাজিরুর রহমান এবং পরিদর্শক (অপারেশন) ছিলেন আরশাদ হোসেন।
একই সময়ে রমনা গোয়েন্দা বিভাগে ডিসি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মো. হুমায়ুন কবীর। এডিসি (অ্যাডমিন) ছিলেন মো. আজহারুল ইসলাম মুকুল, রমনা জোনাল টিমের এডিসি ছিলেন মিশু বিশ্বাস, এসি জাবেদ ইকবাল প্রীতম এবং ধানমন্ডি জোনাল টিমের এডিসি ছিলেন মো. ফজলে এলাহী।
জুলাই আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন মামলায় তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে।
৫ আগস্টের পর ৫৭ পুলিশ কর্মকর্তা কর্মস্থলে ফেরেননি
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ৫৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা কর্মস্থলে ফেরেননি।
সদর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তার কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দল দমনে মাঠপর্যায়ে ভূমিকা রেখেছেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন ও গুলির ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর বিচারের আশঙ্কায় তারা কর্মস্থলে ফেরেননি বলে সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এই তালিকায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম ও সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদসহ পুলিশের ৫৭ কর্মকর্তা রয়েছেন।
‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’
হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডিশনাল আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, রমনা বিভাগের সাবেক ডিবি ডিসি হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি তার জানা নেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের কেউ পলাতক এবং কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়নি এমন কোনো কর্মকর্তা থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় নাম থাকার পরও হুমায়ুন কবীরের গ্রেপ্তার না হওয়া এবং তার বর্তমান অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে দেশ ছাড়ার চেষ্টার অভিযোগের সত্যতা এবং তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।