ইরানে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর ফলে তেল ও গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের জ্বালানি শিল্প, রপ্তানি ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সম্পর্কিত কিছু তথ্য বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদন তুলে ধরেছে।
তেল উৎপাদন ও অবকাঠামো
পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের তৃতীয় বৃহৎ উৎপাদক দেশ হিসেবে ইরান বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জোগান দেয়।
বর্তমানে ইরানের প্রতিদিনের অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল, যার সঙ্গে আরও ১৩ লাখ ব্যারেল কনডেনসেট (প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় পাওয়া এক ধরনের অতি স্বচ্ছ এবং হালকা তরল জ্বালানি) ও অন্যান্য তরল জ্বালানি যুক্ত হয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এফজিই-এর তথ্যমতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলোর দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতা প্রায় ২৬ লাখ ব্যারেল।
ক্লেপলারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসসহ (এলপিজি) দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল জ্বালানি রপ্তানি করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় কিছুটা কম।
ইরানের প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মূলত দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে অবস্থিত; যার মধ্যে খোজেস্তান প্রদেশ তেলের জন্য এবং বুশেহর প্রদেশ (সাউথ পার্স প্রকল্প) গ্যাস ও কনডেনসেটের জন্য বিখ্যাত।
ইরান তাদের মোট অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশই খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করে, যা মূলত সংকীর্ণ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান থেকে তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরব বা ওপেকের অন্যান্য দেশগুলো তাদের বাড়তি সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে। তবে গত এক বছরে তারা নিজেরাই অনেক বেশি তেল উৎপাদন করায়, বর্তমানে হুট করে তাদের নতুন করে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেকটা কমে গেছে।
ইরানের তেলের ক্রেতা যারা
ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হলো চীনের বেসরকারি শোধনাগারগুলো। যদিও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানি তেল কেনার দায়ে কিছু চীনা শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
চীন তাদের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর এই একতরফা নিষেধাজ্ঞা স্বীকার না করলেও ইরান থেকে তারা তেল কেনার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা থেকে মজুত রক্ষা করতে ইরান সমুদ্রের বুকে ভাসমান জাহাজে রেকর্ড পরিমাণ তেল জমিয়ে রেখেছে।
২৭ ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, এই মজুতের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ব্যারেল, যা বিশ্বের প্রায় দুই দিনের মোট ব্যবহারের সমান।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান বছরের পর বছর ধরে নানা কৌশল অবলম্বন করে আসছে, যার মধ্যে রয়েছে মাঝ সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা এবং স্যাটেলাইট ফাঁকি দিতে ট্যাংকারের অবস্থান লুকিয়ে রাখা।
বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস রিজার্ভ
ইরান সাউথ পার্স নামের বিশাল সামুদ্রিক গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে, যা বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ইরান এই ভাণ্ডার বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ কাতারের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে। কাতার তাদের অংশের নাম দিয়েছে নর্থ ডোম।
নিষেধাজ্ঞা এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত গ্যাসের ৯৪ শতাংশ ইরান নিজের দেশের ভেতরেই ব্যবহার করে।
২০২৪ সালে ইরান মোট ২৭৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস উৎপাদন করেছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুনে ইসরায়েলি হামলায় সাউথ পার্সের ফেজ-১৪-এর চারটি ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই এলাকা কাতারের গ্যাস স্থাপনা থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার (১২৫ মাইল) দূরে অবস্থিত। কাতারের অনেক স্থাপনা আবার মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট এক্সনমোবিল এবং কনোকোফিলিপসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত।
কাতার গত তিন দশক ধরে এলপিজি রপ্তানি করে শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
পুরো গ্যাস ভাণ্ডারটিতে আনুমানিক ১ হাজার ৮০০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট ব্যবহারযোগ্য গ্যাস রয়েছে; যা দিয়ে পুরো বিশ্বের ১৩ বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব।