সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘদিন পর বেতন বাড়ানোর উদ্যোগকে যৌক্তিক বললেও, এটি বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য ও ব্যাংকিং খাতের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে বর্তমান বাজারে হিমশিম খাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। অথচ বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় অপরিবর্তিত থাকবে।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর পাঁচ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন পে-স্কেল ঘোষণা হয়নি। গত বছর গঠিত বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করে। বর্তমানে সরকার সেই সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে বলে খসড়া থেকে জানা গেছে। অনুমোদন শেষে চলতি মাসেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রায় এক দশক পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন ছিল। তবে এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যখন দেশের মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে সরকারকে ঋণ নিতে বা বিকল্প উৎস থেকে অর্থ জোগাড় করতে হতে পারে, যা অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
তাদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে বাজারে ভোগব্যয়ও বাড়বে। কিন্তু সেই অনুপাতে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাহিদা বাড়লে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বাড়িয়ে দেন। ফলে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, সরকারি খাতে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেলেও দেশের অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষ বেসরকারি খাতে কর্মরত। তাদের আয় না বাড়লে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আয়বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব দারিদ্র্যের ওপরও পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দ এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে সরকার যদি দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
তবে সরকার বলছে, অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে নতুন বেতন কাঠামো একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে মূল বেতন বাড়ানো হবে, পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভাতা কার্যকর করা হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা