বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শাখায় আমানতকারীরা তাদের জমা অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না। ১৩ দিন ধরে গ্রাহকদের এমন ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। যাদের অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা জমা রয়েছে, তারা মাত্র পাঁচ হাজার টাকার চেক দিলেও ফেরত দিয়ে দিচ্ছে ব্যাংক। এমটিএম ও এটিএম কার্ডও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যাংকের মুনাফা দূরে থাক, মূল আমানতই তুলতে পারছেন না গ্রাহকরা। এতে তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও সারা দেশে আরও চার ব্যাংকে একই ধরনের নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এগুলো হলো—ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, পাঁচ হাজার টাকার মতো সামান্য চেক দিলেও ব্যাংক তা ফেরত দিয়ে দিচ্ছে। এমনকি ডিসেম্বর মাসে যাদের ডিপিএস বা ফিক্সড ডিপোজিটের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে, তাদের নির্ধারিত অর্থও অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে না। প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক মুনাফা স্কিমের অর্থও হোল্ড হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার দৈনন্দিন খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
শাখা পরিবর্তনেও জটিলতা
এ ছাড়া সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে, এক শাখার অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য শাখায় টাকা তোলা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে অ্যাকাউন্ট থাকা কোনো গ্রাহক ঢাকায় বদলি হলে বা অবস্থান করলে সামান্য অর্থ তুলতেও আবার চট্টগ্রাম আসতে হচ্ছে। এতে সময়, খরচ ও মানসিক চাপে পড়ছেন গ্রাহকরা।
এই সংকট শুধু ডিপোজিট অ্যাকাউন্টেই সীমাবদ্ধ নয়। সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট, বেতন অ্যাকাউন্ট, এনআরবি/প্রবাসী অ্যাকাউন্ট, জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট, মানি মার্কেট অ্যাকাউন্ট, এটিএম কার্ড ব্যবস্থাও প্রায় সম্পূর্ণ অকার্যকর বলে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, গত ৪ নভেম্বরের আগে যেসব অ্যাকাউন্টে টাকা প্রবেশ করেছিল, তাদের অনেকেই টাকা তুলতে পেরেছেন। কিন্তু তার পরের সময়ে যাদের একাউন্টে প্রফিট বা ডিপোজিট এসেছে, তারা কেউই টাকা তুলতে পারেননি।
নিউজিল্যান্ড থেকে আসা গ্রাহক এহসানুল করিমের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা পাঁচ বছর ধরে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে জমা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে তিনি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে এক হাজার টাকাও তুলতে পারেননি। বাধ্য হয়ে খালি হাতেই ফিরে যেতে হয়েছে তাকে। যাওয়ার সময় কষ্টভরা মন নিয়ে তিনি বলেন, ‘টাকাগুলো এখানে রেখে দিয়েছিলাম, দেশে ফিরে তুলে নিজের খরচ মেটাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু সেটাও হলো না।’
কানাডা থেকে মনময়ী হাসান জানান, বাবার চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য তিনি মাসিক মুনাফা স্কিমে জমা রাখা ১২ লাখ টাকার প্রতি মাসের মুনাফার অর্থ তুলতে পারছেন না। অথচ ওই মুনাফার টাকাতেই তার বাবা প্রতি মাসে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে থাকেন।
নাম প্রকাশ না করা এক অধ্যাপিকা বলেন, তার ডিপিএস ম্যাচিওর হয়েছে, কিন্তু তিনি এখনো টাকা তুলতে পারছেন না। ছেলের টিউশন ফি দেওয়ার জন্য ধার নিতে হয়েছে। এভাবে কতদিন পর তিনি তার টাকা তুলতে পারবেন, তা-ও নিশ্চিত নয়।
বেবী চৌধুরি, যিনি সিটি করপোরেশনের ঝাড়ুদার, তার ১২ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলেন। বর্তমানে অসুস্থ তিনি। ইন্ডিয়াতে চিকিৎসার জন্য যাবেন। কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। এতে তিনি ও তার পরিবার মানসিক ও আর্থিক চাপে পড়েছেন।
শাহীনুর করিম জানান, তার স্বামীর রিটায়ারমেন্টের পর ব্যাংক কর্মকর্তা অনুরোধে টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে জমা করেছিলেন। মাসিক মুনাফা স্কিমে দেড় বছর ধরে তিনি টাকা তুলতে পারেননি। পূর্বে ব্যাংক কর্মকর্তা ভাগ্নিকে টাকা তুলে দিতে বলতেন, কিন্তু বর্তমান নতুন নিয়মে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বিদেশে থাকা গ্রাহকদের পরিস্থিতি আরও খারাপ। তারা নিজে উপস্থিত না হলে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে কেউ টাকা তুলতে পারছে না। ব্যাংক শুধু গ্রাহকের উপস্থিতি ো ভোটার আইডি কার্ড সঙ্গে আনার শর্তে টাকা তুলতে দিচ্ছে। ফলে অনেক প্রবাসী ও বৃদ্ধ গ্রাহকদের পেনশন বা অন্যান্য জরুরি অর্থ পাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, ৩০ ডিসেম্বর দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সময়সূচি ও সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিশেষ স্কিম চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনের অনুযায়ী, সাধারণ গ্রাহকদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে এবং যেকোনো সময় তা উত্তোলন করা যাবে। তবে দুই লাখ টাকার বেশি আমানতকারীদের ক্ষেত্রে অর্থ কিস্তিতে উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আন্দোলনের ডাক
এদিকে ১৩ জানুয়ারি পাঁচ ব্যাংকের ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একটি ফেসবুক গ্রুপে করা পোস্ট ভাইরাল হয় এবং বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কাফনের কাপড় বেঁধে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। মাত্র এক ঘণ্টায় প্রায় এক হাজার গ্রাহক এতে সমর্থন জানান। এ ছাড়া বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে।
জানতে চাইলে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখার ম্যানেজার এহসান হক বলেন, ‘গত ৪ নভেম্বরের আগে যেসব অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়েছে, শুধু সেই টাকাই দেওয়া হচ্ছে।’
মাসিক মুনাফার স্কিমের টাকা কেন দেওয়া হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা বা আদেশ তারা পাননি। সঞ্চয়ী হিসাব, ফিক্সড ডিপোজিটসহ অন্যান্য ক্যাটাগরির জমাকৃত টাকাও বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রামের নির্বাহী পরিচালক মো. মকবুল হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তাদের করার কিছু নেই। দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দেখছেন।