অভাব, অনুপস্থিত উপবৃত্তি ও সামাজিক চাপ সব মিলিয়ে থেমে যাচ্ছে একটি
অভাব, অনুপস্থিত উপবৃত্তি ও সামাজিক চাপ সব মিলিয়ে থেমে যাচ্ছে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ
মাঠ প্রতিবেদন | ময়মনসিংহ | মে ২০২৫
মাত্র ১১ বছর বয়সে থেমে গেল সুমির স্কুলজীবন। ক্লাস ফোরে পড়া অবস্থায় হঠাৎ আর স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। তিন মাস কেটে গেছে, আর খোঁজও নেয়নি কেউ। সুমির মা রুনা বেগম জানালেন “উপবৃত্তির টাকাও পাইনি, আর স্কুলের পোশাক কিনতে পারছিলাম না। মেয়েটাকে ঘরের কাজেই লাগিয়ে দিয়েছি।” এভাবেই নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে হাজারো শিশু। সরকার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, প্রাথমিক শিক্ষার এই ‘অধিকার’ এখনো অনেক শিশুর কাছে অধরা।
শিশু ঝরে পড়ার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BANBEIS) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার দাঁড়িয়েছে ১৪.২ শতাংশে। গ্রামাঞ্চলে এ হার শহরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে
- অর্থনৈতিক অনটন
- উপবৃত্তি না পাওয়া বা বিলম্বে পাওয়া
- বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব
- শিশু শ্রমে নিয়োজিত হওয়া
- বাল্যবিবাহ ও সামাজিক মানসিকতা
শিক্ষকদের বক্তব্য: সুমির স্কুলের সহকারী শিক্ষক বলেন “আমরা চিঠি দিয়ে সুমির মাকে ডেকেছিলাম। কিন্তু তারা বলেছে ঘরের কাজ, বোনের দেখাশোনা আর টাকার অভাবে মেয়েকে আর পাঠাতে পারবে না। আমাদের হাতেও সীমাবদ্ধতা আছে।” তিনি আরও বলেন, “স্কুলে মিড ডে মিল, ইউনিফর্ম বা প্রয়োজনীয় খাতা-কলম না থাকলে অভিভাবকরা সন্তানদের টানতে পারেন না।” সমাজকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া ‘শিশু অধিকার জোট’-এর পরিচালক মাহবুবা রশীদ বলেন, “শিশুরা স্কুলছুট হচ্ছে, অথচ স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তারা কাগজে কেবল ‘উপস্থিতি’ দেখাচ্ছেন। স্কুলে না আসা শিশুরা কোথায় গেল, সেটা জানার কোনো নজরদারি নেই।” প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, “২০২৫ সালে আমরা ঝরে পড়া শিশুদের ট্র্যাক করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ‘ডিজিটাল রিটার্ন প্ল্যাটফর্ম’ চালুর পরিকল্পনা করছি। এছাড়াও ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘স্কুল ফলোআপ কমিটি’ গঠন করা হবে।”
বাল্যবিবাহ ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার ১২ বছর বয়সী রিমা কয়েক মাস আগে স্কুল ছেড়ে দেয়। সম্প্রতি তার বিয়ে হয়ে গেছে। রিমার বড় ভাই বলেন “স্কুলে গেলে তো খরচ, বরং বিয়েই ভালো।” জাতীয় মহিলা সংস্থার এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া মেয়েদের মধ্যে ৬৭ শতাংশই তিন বছরের মধ্যে বিয়ের পিঁড়িতে বসে।
করণীয়
- স্কুলে বাধ্যতামূলক মিড ডে মিল কার্যক্রম চালু করা
- প্রান্তিক এলাকায় স্কুলে যাতায়াতের জন্য বিনামূল্যে পরিবহন ব্যবস্থা
- ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশু ঝরে পড়া পর্যবেক্ষণ কমিটি
- উপবৃত্তি প্রদানে স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতা
- স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা প্রচারণা ও মা-বাবার কাউন্সেলিং
সুমির গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এটা হাজারো ঝরে পড়া শিশুর প্রতিচ্ছবি। উপবৃত্তি, স্কুলের পোশাক, বা একবেলার খাবার যদি সময়মতো না মেলে তাহলে বই ফেলে শিশুরা আবার রাস্তায় কিংবা চুলায় আগুন জ্বালাতেই বাধ্য হয়। শিক্ষা অধিকার বাস্তবায়নের জন্য এখন সময় এসেছে মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও সম্পৃক্ততা জোরদার করার।