কিছু গল্প আছে, যা চাপা পড়ে থাকতে চায় না। আড়ালে আবডালে দানা বাঁধতে থাকে, কিছুটা লোকমুখে আর কিছুটা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়—যতক্ষণ না নতুন কিছু সেগুলোকে আবার আলোয় টেনে আনে।
এবার সেই অনুঘটক হলো ধুরন্ধর ২।
চলচ্চিত্রটি কেবল রূপালী পর্দার জগতকে পুনরুজ্জীবিত করেনি, বরং এটি করাচির আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়াবহ ও বিতর্কিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও সামনে এনেছে।
দাউদ ইব্রাহিম ও লেয়ারির (করাচির অন্যতম পুরনো ও জনবহুল এলাকা) ডন রেহমান ডাকাইতের মধ্যকার সেই চরম সংঘাত—যা ক্ষমতা, প্রতিশোধ এবং লোকদেখানো দম্ভের সীমানাকে ঝাপসা করে দিয়েছিল।
এক টুকরো জমি
এই সহিংস উপাখ্যানের কেন্দ্রে রয়েছে খুব সাধারণ একটি বিষয়—জমি। ২০০৯ সালের দিকে দাউদ ইব্রাহিম তার বিশাল ডি-কোম্পানি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে করাচির শত কোটি রুপি মূল্যের একটি প্লটের ওপর নজর দেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি রুপি মূল্যের সেই জমিতে একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প বা সম্ভবত একটি মল তৈরির পরিকল্পনা ছিল।
তবে দাউদের পক্ষ থেকে যে দাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্যরকম কম।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি প্রতিবেদন বলছে, টেবিলে মাত্র ১ কোটি রুপি রাখা হয়েছিল। আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০-১২ কোটি রুপি।
যাই হোক না কেন, এটি কোনো আলোচনা ছিল না; এটি ছিল সরাসরি চাপ প্রয়োগ। জমির মালিক, যিনি রেহমান ডাকাইতের আত্মীয় বলে পরিচিত, তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এরপর যে হুমকি দেওয়া হয়, তা সবকিছু বদলে দেয়। দাউদের পক্ষ থেকে নাকি তাকে বলা হয়েছিল—হয় দিতে চাওয়া অর্থ গ্রহণ করো, নয়তো জমি এবং অর্থ দুটোই হারানোর ঝুঁকি নাও।
এই হুমকি রেহমান সহজভাবে নেননি। বিষয়টি যখন তার কানে পৌঁছায়, তিনি সরাসরি ফোন করে দাউদের লোকদের দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেন।
কিন্তু দাউদের পক্ষ পিছিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে কথা কাটাকাটি আরও বাড়িয়ে দেয়। চলে গালিগালাজও।
লেয়ারির পথঘাট নিয়ন্ত্রণ করা রেহমান ডাকাইতের কাছে এটি তখন আর কেবল জমির লড়াই ছিল না; এটি হয়ে দাঁড়ায় আত্মসম্মানের লড়াই।
সেই অপহরণ, যা আন্ডারওয়ার্ল্ডকে স্তম্ভিত করেছিল
এর পরবর্তী ঘটনাটি কেবল প্রতিশোধ ছিল না; এটি ছিল একটি বার্তা দেওয়ার জন্য সুপরিকল্পিত নাটক।
দাউদ ইব্রাহিমের ছোট ভাই নূর-উল-হক ওরফে নূরা অপহৃত হন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত নৃশংস।
নূরাকে বন্দি করে একটি খামারবাড়িতে রাখা হয়েছিল এবং সেখানে তাকে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়।
কিছু প্রতিবেদন দাবি করে, তাকে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছিল। আবার কিছু প্রতিবেদন বলে, তাকে দীর্ঘসময় ধরে শারীরিক নির্যাতন করা হয়; যার উদ্দেশ্য তথ্য আদায় নয়, বরং আতঙ্ক তৈরি করা।
এরপর আসে সেই ফোন কল। ধারণা করা হয়, রেহমান ডাকাইত সরাসরি দাউদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তার ভাইয়ের আর্তনাদ শুনতে বাধ্য করেন। এটি ছিল চরম এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই।
যে ব্যক্তির (দাউদ) সাম্রাজ্য চলত অন্যকে ভয় দেখিয়ে, তিনি নিজেই এবার সেই ভয়ের শিকার হলেন।
নিরুপায় হয়ে দাউদ নাকি সমঝোতার প্রস্তাব দেন। শুধু বিতর্কিত জমি নয়, ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোটা অংকের অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয় (কিছু সূত্রের মতে, প্রায় ৫৮০ কোটি রুপি)। এটি ছিল সবদিক থেকেই আত্মসমর্পণ। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি।
নূরা হত্যাকাণ্ড
সমঝোতা চলা সত্ত্বেও নূরাকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর ধরনটি এই শত্রুতার সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো দিক।
বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, তাকে লক্ষ্য করে ছয় থেকে সাতটি গুলি করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই ছিল মাথায়। তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল।
দাউদ ইব্রাহিমকে চূড়ান্তভাবে অপমান ও প্ররোচিত করতে নূরার মরদেহ করাচিতে দাউদের বাসভবনের কাছে ফেলে রাখা হয়।
তবে প্রকাশ্যে ভিন্ন গল্প সামনে আনা হয়। দাউদের পরিবার দাবি করে, নূরা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি নিশানায় লেয়ারির গ্যাং ওয়ার এবং রেহমান ডাকাইতের পদ্ধতির ছাপ ছিল। বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল খুব জোরালোভাবে।
ভয়, ক্ষমতা এবং অপরাজেয়তার মিথ
বছরের পর বছর ধরে দাউদ ইব্রাহিম নিজের চারপাশে একটি অপরাজেয় বলয় তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা সেই মিথ চূর্ণ করে দেয়। কেবল ভাই হারানোর জন্য নয়, বরং যেভাবে এটি ঘটেছিল তার কারণে। রেহমান ডাকাইত কেবল তাকে চ্যালেঞ্জই করেননি, অপমানও করেছিলেন। লেয়ারিতে রেহমানের খ্যাতি বাড়তে থাকে।
কারো কাছে তিনি ছিলেন রবিন হুড, আবার কারো কাছে অকল্পনীয় নৃশংসতায় সক্ষম এক দুর্ধর্ষ অপরাধী। কিন্তু তার এই উত্থানের মধ্যেই তার পতনের বীজ নিহিত ছিল। আন্ডারওয়ার্ল্ড দীর্ঘকাল ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সহ্য করে না।
রেহমান ডাকাইতের পতন
কয়েক মাস পরে ২০০৯ সালের আগস্টে রেহমানের গল্পের সমাপ্তি ঘটে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসএসপি চৌধুরী আসলামের নেতৃত্বে এক এনকাউন্টারে তিনি মারা যান।
পুলিশের দাবি, করাচির উপকণ্ঠে রেহমান ও তার সহযোগীদের গতিরোধ করা হলে তারা গুলি ছোড়ে এবং পাল্টা গুলিতে তারা আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাদের মৃত্যু হয়।
চৌধুরী আসলাম তখন বলেছিলেন, ‘তদন্তকারী এসএসপি হিসেবে আমি নিশ্চিত করছি, এটিই রেহমান ডাকাইত।’
এভাবেই করাচির অন্যতম ত্রাস রেহমানের ইতি ঘটে। কিন্তু এই গল্পের অন্যসব কিছুর মতোই সত্যটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
‘সাজানো এনকাউন্টার’ নাকি পরিকল্পিত হত্যা?
রেহমান ডাকাইতের পরিবার পুলিশের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে একে ‘সাজানো হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে। তার স্ত্রী সিন্ধু হাইকোর্টে আবেদন করে অভিযোগ করেন, রেহমানকে আগে আটক করে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে এনকাউন্টারে হত্যা করা হয়েছে।
ময়নাতদন্ত নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিল, যা সাধারণত কোনো বিশৃঙ্খল বন্দুকযুদ্ধের সঙ্গে মেলে না। সহযোগী ও মিত্ররা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের দাবি করে ইঙ্গিত দেন, রেহমানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব শক্তিশালী মহলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও ধোঁয়াশা কাটেনি। এটি কি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ ছিল, নাকি সিস্টেমের পক্ষ থেকে এমন একজনকে সরিয়ে দেওয়া, যিনি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিলেন?
দাউদের নীরব প্রতিশোধ
রেহমান ডাকাইতের মৃত্যুর সঙ্গে দাউদ ইব্রাহিমের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ না থাকলেও, সময় এবং পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনাকে উসকে দেয়।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রতিশোধ সাধারণত খুব একটা হইচই করে নেওয়া হয় না। এটি কাজ করে নেটওয়ার্ক, প্রভাব ও গোপন সমঝোতার মাধ্যমে।
অনেকের বিশ্বাস, রেহমানের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পুলিশি অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল সেই প্রতিশোধের চূড়ান্ত অধ্যায়, যা শুরু হয়েছিল এক টুকরো জমি নিয়ে এবং শেষ হলো রক্তপাতের মধ্য দিয়ে।
পরিণতি এবং এক অম্লান গল্প
চৌধুরী আসলাম নিজেও পরবর্তীতে ২০১৪ সালে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। এদিকে, নূরা হত্যাকাণ্ড এবং রেহমানের মৃত্যুর পেছনের সত্যগুলো সরকারি নথি, গোয়েন্দা দাবি এবং লোকমুখের গল্পের মাঝে বিভক্ত হয়ে আছে।
তা সত্ত্বেও গল্পটি টিকে আছে। কারণ এটি কেবল দুজন মানুষের বিষয় নয়। এটি ক্ষমতার বিষয়—কীভাবে এটি তৈরি হয়, চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং ধ্বংস হয়ে যায়।
এটি ভয়ের গল্প এবং সেই পরিস্থিতির গল্প, যখন ভয়ের কারবারিরা নিজেরাই ভয়ের মুখোমুখি হয়।
ধুরন্ধর ২ হয়তো ঘটনাগুলোকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছে, কিন্তু এর বাস্তব ভিত্তি আরও বেশি অস্বস্তিকর।
দাউদ ইব্রাহিম ও রেহমান ডাকাইতের এই শত্রুতা কেবল দুই গ্যাংস্টারের লড়াই ছিল না। এটি ছিল এক চরম রূঢ় সত্য—আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্যের প্রতিটি কাজই প্রতিশোধের নিশ্চয়তা বহন করে এবং কোনো সাম্রাজ্যই, তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, নাগালের বাইরে নয়।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি