১. সূচনালগ্ন: শক্তির প্রচলিত ধারণা বনাম বাস্তব চিত্র
বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে ওমান এবং ইরানের মধ্যবর্তী এক চিলতে জলপথ 'হরমুজ প্রণালি'কে পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা বলে মনে হয়। ঐতিহাসিক কাল থেকেই ধারণা করা হয়, যার হাতে এই প্রণালির চাবিকাঠি, তার হাতেই বিশ্ব অর্থনীতির নাটাই। দীর্ঘকাল ধরে জল্পনা ছিল যে, ইরান যদি কোনোদিন এই পথটি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আমাদের একটি ভিন্ন এবং চমকপ্রদ সত্যের মুখোমুখি করেছে। আমরা দেখেছি যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার জন্য কোনো মিসাইল, টর্পেডো বা নৌ-অবরোধের প্রয়োজন পড়েনি। বরং লন্ডনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকা কিছু বীমা বিশেষজ্ঞ বা ‘একচুয়ারি’ (Actuaries) একটি স্প্রেডশিটের মাধ্যমে এই জলপথকে প্রায় নিথর করে দিয়েছিলেন।
এটি কোনো সামরিক শক্তির প্রদর্শনী নয়, এটি হলো ‘সিস্টেমিক পাওয়ার’ বা কাঠামোগত ক্ষমতার চূড়ান্ত রূপ। যেখানে যুদ্ধের চেয়েও বড় অস্ত্র হলো ‘ঝুঁকির মূল্যায়ন’ (Risk Assessment)।
২. লন্ডনের বীমা বাজার: বিশ্বের জাহাজ চলাচলের অদৃশ্য চাবিকাঠি
কেন লন্ডন এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু? উত্তরটি লুকিয়ে আছে ৩০০ বছরের ইতিহাসে। ১৬৮০-র দশকে লন্ডনের 'এডওয়ার্ড লয়েডস' কফি হাউস থেকে যে সামুদ্রিক বীমা ব্যবস্থার শুরু হয়েছিল, তা আজ ‘Lloyd’s of London’ নামে পরিচিত এবং এটিই বিশ্ব নৌ-বাণিজ্যের মেরুদণ্ড।
কীভাবে এই বীমা ব্যবস্থা কাজ করে?
বিশ্বের প্রায় ৯০% জাহাজ ‘প্রটেকশন অ্যান্ড ইনডেমনিটি (P&I)’ ক্লাবের সদস্য। বিশ্বের ১৩টি প্রধান P&I ক্লাবের বেশিরভাগই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত এবং তারা লন্ডনের আন্তর্জাতিক পুনঃবীমা বাজারের (Lloyd’s) আওতায় কাজ করে। এই ক্লাবগুলো আবার তাদের বিশাল ঝুঁকির ভার লাঘব করতে লন্ডনের পুনঃবীমা (Reinsurance) বাজারের ওপর নির্ভর করে। যখন কোনো অঞ্চলে যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন এই বীমাকারীরা তাদের নীতিমালায় ‘War Risk’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি যুক্ত করে।
যদি কোনো কারণে লন্ডন ঘোষণা করে যে, ‘আমরা এই রুটে চলা জাহাজের নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিচ্ছি না’, তবে পৃথিবীর কোনো বড় শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজ সেখানে পাঠাবে না। একটি তেলের ট্যাঙ্কারের দাম এবং তার ভেতরের তেলের মূল্য মিলিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কোটি ডলারের সম্পদ থাকে। বীমা ছাড়া এই বিশাল সম্পদ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি কোনো মালিকই নেবেন না। ফলে, ইরান কোনো মিসাইল না ছুঁড়লেও স্রেফ বীমা কোম্পানিগুলোর ‘কভারেজ প্রত্যাহার’ করার সিদ্ধান্তই সমুদ্রপথকে মরুভূমিতে পরিণত করতে পারে।
৩. ট্রাফিক ধস: ৮১% পতনের পেছনের অংক
সাধারণ সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০৭টি বিশালকার জাহাজ চলাচল করে। এটি শুধু তেল নয়, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ এলএনজি (LNG) চলাচলের পথ। গত সপ্তাহে প্রকাশিত Lloyd’s List Intelligence-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার চরম পর্যায়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮১% কমে মাত্র ১৯-এ নেমে এসেছে।
এই যে ৮১% ট্রাফিক ধস, এর কারণ ইরান বা আমেরিকার নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ সংঘাত নয়। বরং বীমা কোম্পানিগুলো যখন প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দেয় বা কভারেজ বন্ধ করে দেয়, তখন বড় বড় কন্টেইনার ক্যারিয়ার এবং অয়েল ট্যাঙ্কারগুলো মাঝপথে তাদের রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। যারা পথ পরিবর্তন করতে পারে না, তারা বন্দরে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করে। এভাবেই একটি ‘ফিন্যান্সিয়াল ব্লকেড’ বা আর্থিক অবরোধ তৈরি হয়।
৪. ভূ-রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের ওপর এর প্রভাব
ক. ইরান: নিজের অস্ত্রেই নিজে ক্ষতবিক্ষত
ইরান প্রায়ই হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয়, কিন্তু বাস্তবে এটি তাদের জন্য একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। ইরানের প্রায় ১০০% তেল রপ্তানি এই পথ দিয়েই হয়। যদি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়, তবে ইরানের তেল বিক্রির টাকা আসা বন্ধ হয়ে যাবে, যা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। ইরান জানে, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধ করলেই আমেরিকা ও তার মিত্ররা সামরিক হস্তক্ষেপের ‘ক্যাসাস বেলি’ (Casus Belli) পেয়ে যাবে। তাই ইরান ‘গ্রে জোন’ ট্যাকটিক্স ব্যবহার করে; অদৃশ্য ড্রোন হামলা, ট্যাংকার আটক,যাতে বীমা কোম্পানিগুলো নিজ থেকেই ঝুঁকি এড়িয়ে চলে।
খ. চীন: জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট
চীনের প্রায় ৪০% অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে আসে। তাছাড়া ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হলো চীন। হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটা মানে বেইজিংয়ের কলকারখানা এবং পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে যাওয়া। একারণেই ভূ-রাজনীতিতে চীন যতই আমেরিকার বিরোধী হোক না কেন, হরমুজ সংকটের সময় তারা সবসময়ই স্থিতিশীলতার পক্ষে কথা বলে।
গ. রাশিয়া: স্বল্পমেয়াদী সুবিধাভোগী
উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল সরবরাহ কমলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ে। এর ফলে রাশিয়ার সাইবেরিয়ান তেলের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পায়। মস্কোর যুদ্ধকালীন অর্থনীতির জন্য এটি এক প্রকার আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়।
৫. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: লন্ডনের স্প্রেডশিট কীভাবে ঢাকার রান্নাঘরে প্রভাব ফেলে?
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, লন্ডনের একটি বীমা কোম্পানি কী সিদ্ধান্ত নিল, তার সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কী? উত্তরটি সহজ—বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ববাজারের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
৬. জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট
বাংলাদেশ তার বিদ্যুতায়নের জন্য এলএনজি (LNG)-র ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। কাতার ও ওমান থেকে আসা এলএনজি জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি পার হতে হয়। যদি লন্ডনের বীমা কোম্পানিগুলো ‘War Risk’ চার্জ বাড়িয়ে দেয় বা কভারেজ তুলে নেয়, তবে পেট্রোবাংলা নির্ধারিত সময়ে গ্যাস আমদানিতে হিমশিম খাবে। এর ফলে:
● শিল্প কারখানায় গ্যাস সংকট তীব্র হবে।
● শহর ও গ্রামে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আকাশচুম্বী হবে।
● উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প সংকটে পড়বে।
৭. জীবনযাত্রার ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি ও ডলার সংকট
বাংলাদেশ তার চাহিদার সিংহভাগ জ্বালানি তেল এবং ভোজ্যতেল আমদানি করে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা মানেই হলো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি। যখনই তেলের দাম বাড়ে, তার প্রভাব চেইন রিঅ্যাকশনের মতো প্রতিটি পণ্যে পড়ে।
● ট্রাক ও লরি ভাড়া বেড়ে যায়।
● ঢাকা বা চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে চাল, ডাল ও নিত্যপণ্যের দাম সরাসরি বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ বর্তমানে ডলার সংকটে ভুগছে। হরমুজ সংকট তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন বাংলাদেশকে একই তেল কিনতে আগের চেয়ে দ্বিগুণ ডলার খরচ করতে হবে। এটি সরাসরি আমাদের রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াবে এবং টাকার মান আরও দুর্বল করবে।
এ ছাড়া, পশ্চিমা ক্রেতারা (জারা, এইচঅ্যান্ডএম, ওয়ালমার্ট ইত্যাদি) যখন দেখবে যে বাংলাদেশের আমদানিকৃত কাঁচামাল (তুলা সুতা, কেমিক্যাল) সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না বা শিপিং কস্ট দ্বিগুণ হয়েছে, তখন তারা বিকল্প দেশ (ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ইত্যাদি) খুঁজতে শুরু করবে। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি।
৮. রেমিট্যান্স ও জনশক্তি বাজার
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়ে, তবে সেখানে থাকা কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। নতুন শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ হবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য একটি অশনিসংকেত।
৯. খাদ্য নিরাপত্তা
বাংলাদেশ প্রায় ১৫ লাখ টন গম আমদানি করে। হরমুজ প্রণালিতে সংকট বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ব্যাহত করে, যা ভোজ্যতেলের মতো গম, ডাল ও চিনির দামেও প্রভাব ফেলে। মুদ্রাস্ফীতির এই চাপ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
১০. বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত বিকল্প কী হতে পারে?
লন্ডন বা পশ্চিমাদের এই ‘ফিন্যান্সিয়াল কন্ট্রোল’ থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কী করতে পারে?
● জ্বালানির উৎসের বহুমুখীকরণ: শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং রাশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলো (যেমন: নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা) থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করা। একই সঙ্গে ভারতের সাথে বিদ্যুৎ বিনিময় চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
● আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি ও বিকল্প রুট: ভারত ইতিমধ্যে ইরানের চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় সংযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশ এই চাবাহার রুটকে কাজে লাগিয়ে আমদানি-রপ্তানি বহুমুখী করতে পারে, যা হরমুজের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাবে। এছাড়া, মিয়ানমারের মাধ্যমে চীনের সাথে স্থলপথ ও বন্দর সংযোগের সম্ভাবনাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা।
● অর্থনৈতিক কূটনীতি ও মুদ্রাভিত্তিক লেনদেন: লন্ডন বা পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশের উচিত চীন, রাশিয়া, ভারত ও জাপানের সঙ্গে ‘কারেন্সি সুয়াপ’ বা নিজস্ব মুদ্রায় (রুপি-ইউয়ান-টাকা) বাণিজ্য চুক্তি জোরদার করা, যাতে ডলার সংকট ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানো যায়।
● নবায়নযোগ্য জ্বালানি: দেশের অভ্যন্তরে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের গতি বৃদ্ধি করা যাতে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমে। ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমে বিনিয়োগ বাড়ানো।
● শিপিং ও বীমা সেক্টরে সক্ষমতা বৃদ্ধি: নিজস্ব ফ্ল্যাগবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো এবং স্থানীয় বীমা কোম্পানিগুলোকে শক্তিশালী করা, যাতে চরম সংকটে বিদেশি বীমা খাতের ওপর ১০০% নির্ভর করতে না হয়। একটি ন্যাশনাল মেরিন ইনস্যুরেন্স পুল গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা।
১১. উপসংহার: আধুনিক বিশ্বের নতুন সীমান্ত
আজকের পৃথিবীতে সীমান্ত কেবল কাঁটাতারে নয়, বরং সিস্টেমের ভেতরে অবস্থিত। আমরা আগে ভাবতাম যুদ্ধ মানেই হলো ট্যাংক আর মিসাইল। কিন্তু হরমুজ প্রণালির এই ঘটনা আমাদের শেখালো যে, যুদ্ধ মানে এখন আর্থিক ডেটা (Financial Data)।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী যা করতে পারে না, লন্ডনের বীমা বাজার তা এক মুহূর্তে করে দিতে পারে। বাংলাদেশ যদি একটি উন্নত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তবে আমাদের কেবল সামরিক দিক দিয়ে নয়, বরং আর্থিক, জ্বালানি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থার দিক দিয়েও স্বনির্ভর ও কৌশলী হতে হবে।
শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম মিসাইলই শক্তি। কিন্তু এখন মনে রাখতে হবে, মিসাইল শুধু শিরোনাম তৈরি করে; স্প্রেডশিট ঠিক করে দেয় আপনার ঘরের আলো জ্বলবে কি জ্বলবে না।
লেখক: কাজী সালিমুল হক
সাবেক সংসদ সদস্য ও দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান। সামুদ্রিক বীমা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ।