‘এল নিনো’ শুরু হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত শক্তিশালী রূপ নেবে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) ডব্লিউএমওর বরাতে জেনেভা থেকে এএফপি জানায়, জলবায়ুবিষয়ক এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি দ্রুত তীব্রতর হবে। তাই সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় দেশগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
এল নিনোর কারণে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর এল নিনো দেখা দেয় ও এর স্থায়িত্ব হয় প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস।
এল নিনো ও এর বিপরীত অবস্থা ‘লা নিনা’-এর মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন ঘটে। মাঝখানে থাকে নিরপেক্ষ পরিস্থিতি।
ডব্লিউএমওর মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’-এ বলা হয়েছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে এল নিনো শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাবে।
সংস্থাটি এল নিনোকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অত্যন্ত শক্তিশালী, এই চার শ্রেণিতে ভাগ করে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী এটি তৃতীয় স্তর অর্থাৎ ‘শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ডব্লিউএমও জানায়, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে ও আগামী কয়েক মাসে এটি দ্রুত শক্তিশালী হবে। এর ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বাড়বে।
ডব্লিউএমওর জলবায়ুবিজ্ঞানী আলভারো সিলভা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘গত মাসের তুলনায় এখন অনেক বেশি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে যে বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে যদি দেখা যায় এটি আরও তীব্র রূপ নেবে, তাহলে আগামী মাসগুলোতে ডব্লিউএমও নতুন হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করবে।’
জেনেভাভিত্তিক সংস্থাটি জানায়, বিভিন্ন বৈশ্বিক জলবায়ু কেন্দ্রের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধারাবাহিক ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ডব্লিউএমওর মতে, গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে মৌসুমি গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে।
সংস্থাটি আরও জানায়, উত্তর গোলার্ধের শরৎকালজুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হবে ও বিশ্বের বহু অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে।
সবশেষ এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সাল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর হয়েছিল। আর ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর, যখন বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব (১৮৫০-১৯০০) সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছে, তবে এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব সাধারণত পরে আরও স্পষ্ট হয়।
সিলভা বলেন, ‘এল নিনোর প্রভাব চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত ও ২০২৭ সালেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হবে।’
কৃষি ও স্বাস্থ্যসহ জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে প্রস্তুত রাখতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে জানিয়েছে ডব্লিউএমও। সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘মানুষের জীবন রক্ষা এবং অর্থনীতি ও সমাজে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এসব আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘এল নিনো ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে ও দ্রুত শক্তিশালী হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে বহু অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, স্থলভাগে তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়বে।’
ডব্লিউএমওর হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি থেকে উত্তর অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব জনবসতিপূর্ণ স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর ঘনঘন সৃষ্টি বা তীব্রতা বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ নেই। তবে সংস্থাটির মতে, উষ্ণতর সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল চরম আবহাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও আর্দ্রতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে এল নিনোর কারণে উষ্ণ সমুদ্রের পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়াতে পারে। বিপরীতে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি ও বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে বৃহস্পতিবার পেরু এল নিনোজনিত ভারী বৃষ্টিপাতের ‘আসন্ন ঝুঁকির’ কারণে দেশটির এক হাজার ৮০০ পৌরসভার মধ্যে ৮০০টিতে ৬০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দেশটিতে ৯৩ লাখেরও বেশি মানুষ বন্যা ও ভূমিধসের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক করা হয়েছে।