ঢাকার ব্যস্ততম দিলকুশা এলাকায় উঁচু সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গভবন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনার ইতিহাস অবশ্য বাংলাদেশের জন্মেরও অনেক আগের।
আজ যেখানে বঙ্গভবন, কয়েক শতাব্দী আগে সেখানে কোনো রাষ্ট্রীয় ভবন ছিল না। ছিল দুই জনের সমাধি, যা পরিচিতি পেয়েছিল মাজার হিসেবে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটি কখনো হয়েছে বাগানবাড়ি, কখনো ব্রিটিশ শাসকের বাসভবন, কখনো আবার গভর্নর হাউজ।
শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে এর নাম হয় বঙ্গভবন। কিন্তু মাজার ও বাগানবাড়ি থেকে কীভাবে এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ভবনে রূপ নিল?
সুলতানি আমলের মাজার থেকে মুঘলদের নওয়ারা মহল
বঙ্গভবনের ইতিহাস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় বাংলার সুলতানি আমলে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া-এর তথ্য অনুযায়ী, সুলতান ইউসুফ শাহের শাসনকালে (১৪৭৪-১৪৮১), অর্থাৎ পঞ্চদশ শতকের দিকে সুফিসাধক শাহ জালাল দাখিনী তার কয়েকজন শিষ্যসহ গুজরাট থেকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে আসেন। ঢাকায় যে এলাকাটি এখন মতিঝিল, এর কাছেই একটি খানকাহ (গৃহ বা আস্তানা) প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে ধর্ম প্রচার শুরু করেন।
১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতানের লোকজনের হাতে তিনি ও তার অনুসারীরা নিহত হন। লেখক আবু জাফরের ‘রাজভবন থেকে বঙ্গভবন’ বইতে আছে, ইউসুফ শাহের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর মন্তব্য করায় সুলতানের সেনারা তাকে হত্যা করেছিলেন।
পরে বঙ্গভবনের ভেতরেই শাহ জালাল দাখিনীকে সমাহিত করা হয়। লেখক ও গবেষক আবু জাফরের ‘রাজভবন থেকে বঙ্গভবন’ বইয়ে বলা আছে, ‘বঙ্গভবনের মূল গেট দিয়ে ঢুকেই বাম হাতে একটি কবরের একটি গম্বুজ। কিন্তু ভেতরে দুটো বাঁধানো কবর। এ দুজনের নাম শাহ জালাল ও শাহ কামাল।’
শাহ কামাল সম্ভবত ছিলেন শাহ জালাল দাখিনীর মুরিদ, যাকে তার পাশেই কবর দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে দাখিনীর সমাধি ঘিরে জায়গাটি মাজার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই এক গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধটি আজও বঙ্গভবন এলাকার ভেতরে রয়েছে।
পরে মুঘল আমলেও এই এলাকার ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হয়। মুঘল শাসনামলে সুবাহদার মীর জুমলার অধীনে নওয়ারা মহলের দায়িত্বে ছিলেন মির্জা মুকিম। তার বাসভবন ছিল পুরানা পল্টন ময়দানের (বর্তমান ঢাকা স্টেডিয়াম এলাকা) দক্ষিণে, বর্তমান বঙ্গভবন বা দিলকুশা এলাকায়।
সুবা বা প্রদেশের শাসক বা গভর্নরকে সুবাহদার বলা হতো মুঘল আমলে। বাংলা তখন মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবা ছিল, যার নাম ছিল সুবাহ বাংলা। আর, সে সময় নদীপথ রক্ষা ও নৌবহর পরিচালনার জন্য গঠিত বিশেষ নৌবাহিনী বা ‘নওয়ারা’ এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত এলাকাকে ‘নওয়ারা মহল’ বলা হতো।
মির্জা মুকিমের বাসভবন এলাকার ভেতর ও বাইরের অংশে দুটি বড় টিলা ছিল। ওই সময়কার একটি বড় টিলা এখনো বঙ্গভবনের সীমানার মধ্যে রয়েছে। বর্তমান মতিঝিল নামটির সঙ্গেও এই এলাকার পুরোনো ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
কথিত আছে, মীর মুকিমের মেয়ে অন্দরমহলের একটি দিঘিতে প্রতিদিন অলংকার ফেলতেন। সেখান থেকেই স্থানটির নাম হয় ‘মতিঝিল’, অর্থাৎ মোতি বা মুক্তার ঝিল।
মানুক হাউজ থেকে দিলকুশা বাগান
ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে জায়গাটির মালিকানা আবার বদলে যায়। বঙ্গভবন চত্বরে এখনো ‘মানুক হাউজ’ নামে একটি ভবন রয়েছে। ধারণা করা হয়, ব্রিটিশ আমলে মানুক নামের একজন আর্মেনীয় জমিদারের মালিকানায় ছিল এটি।
পরে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি মানুকের কাছ থেকে জায়গাটি কিনে নেন। সেখানে তিনি একটি বাংলো নির্মাণ করেন এবং স্থানটির নাম দেন দিলকুশা বাগ।
ঢাকার নবাবদের এই বাগানবাড়ি ছিল বেশ বিস্তৃত। বর্তমান বঙ্গভবন ও এর উত্তরের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল দিলকুশা বাগান। সেখানে ছিল আঁকাবাঁকা লেক, বিভিন্ন ধরনের ফোয়ারা, রঙবেরঙের মাছের চৌবাচ্চা এবং দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির গাছ, ফল ও ফুলের বাগান।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশদের একটি সিদ্ধান্ত এই স্থানের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি পাল্টে দেয়।
বঙ্গভঙ্গের পর তৈরি হলো গভর্নমেন্ট হাউজ
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলা ভাগ করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন একটি প্রদেশ গঠন করে। সেই নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকাকে। প্রাদেশিক প্রশাসনের প্রয়োজন মেটাতে রাজধানী হিসেবে ঢাকায় তখন বেশ কিছু সরকারি ভবন ও কার্যালয় গড়ে ওঠে।
তখন নতুন প্রদেশের প্রধান শাসনকর্তা তথা লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পান স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার ও তার অস্থায়ী বাসভবন নির্মাণের পরিকল্পনা হয় দিলকুশার দক্ষিণাংশে (এখন যেখানে বঙ্গভবন), যা দানা দিঘির ময়দান নামে পরিচিত ছিল। এর আগে, ইমারত বলতে এই অংশে ছিল শুধু ওই মানুক হাউজ।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে লিখেছেন, ১৯০৬ সালে গভর্নমেন্ট হাউজ উদ্বোধন হলেও নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয় ১৯১১ সালে।
সে সময়ের ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘এই প্রাসাদ নির্মাণে অধিক টাকা ব্যয়িত হইয়াছে। অস্থায়ী আবাস হইলেও প্রাসাদের পরিপাটি নির্মাণে কোনরূপ ত্রুটি হয় নাই।’
এ ছাড়া বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দিলকুশা বাগের একাংশ কিনে সরকার সেখানে ভারতের ভাইসরয়ের (ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ ব্রিটিশ শাসনকর্তা) জন্য একটি ভবন নির্মাণ করে।
১৯১১ সাল পর্যন্ত পূর্ববাংলায় সফরের সময় ভাইসরয়ও এখানেই বাস করতেন। সে সময় এই ভবনটি নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট হাউজ’ এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সেই নামই বহাল ছিল। মূলত, ওই সময় থেকেই প্রশাসনিক ভবন হিসেবে আজকের বঙ্গভবনের যাত্রা শুরু।
তবে নতুন প্রদেশ বেশিদিন টেকেনি। প্রবল রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকা তার প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা হারায়। ফলে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের নিয়মিত বাসভবন হিসেবেও ভবনটির ব্যবহার শেষ হয়। তবে পরে বাংলার গভর্নর ঢাকা সফরে এলে এই ভবনে অবস্থান করতেন।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত এটি সেই কাজে ব্যবহৃত হতো।
পাকিস্তান আমলে ‘গভর্নর হাউজ’
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হলে ঢাকা আবার প্রাদেশিক রাজধানী হয়।
ব্রিটিশ আমলের গভর্নমেন্ট হাউজ তখন পূর্ববঙ্গের নতুন প্রাদেশিক শাসনকর্তা তথা ‘গভর্নর’-এর কার্যালয় ও বাসস্থান নির্বাচিত হয় ব্রিটিশ আমলের গভর্নমেন্ট হাউজ। এ সময় গভর্নমেন্ট হাউজ এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গভর্নর হাউজ’।
তবে ১৯৬১ সালে একটি ঝড়ে পুরোনো ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত, ব্রিটিশ আমলের সেই গভর্নমেন্ট হাউজ নির্মাণ করা হয়েছিলো কাঠ দিয়ে। এটি ছিল পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। একতলা ভবনের মেঝের আয়তন ছিল ২৫ হাজার ১২৮ বর্গফুট। এর ছাদ ছিল টিনের।
পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি ভবনের ছাদ ছিল চৌচালা। মাঝের ভবন যা অন্য কক্ষগুলোকে সংযুক্ত করেছিল সেটা ছিল দোচালা। মেঝে ছিল মাটি থেকে চারফুট উঁচু, সেগুন কাঠের।
অর্থাৎ, ভবনটি কাঠের খুঁটির উপর নির্মিত হয়েছিল সে জন্য এটি কাঠের প্রাসাদ বা টিম্বার প্যালেস নামেও খ্যাত ছিল, বলা হয়েছে ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে।
১৯৬১ সালের সেই ঝড়ে কাঠের প্রাসাদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং তৎকালীন গভর্নর আজম খান মানুক হাউজে বসবাস শুরু করেন, গভর্নরের জন্য নতুন বাসভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ জন্য তিনি বেছে নেন লাহোরের স্থপতি মজনুদ্দিন চিশতীকে।
ইসলামী স্থাপত্যের অনুকরণে এর নকশা করার অনুরোধ জানানো হয়। চিশতীর নকশা অনুসারেই নির্মিত হয় সেই ‘গভর্নর হাউজ’। এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছিল ১৯৬৪ সালে।
১৯৭১ সালে গভর্নর হাউজে হামলা
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হাউজে (বর্তমান বঙ্গভবন) হামলা চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। দিনটি ছিল ১৪ ডিসেম্বর।
সেদিন গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে ভারতীয় বিমানবাহিনী জানতে পারে, গভর্নর আবদুল মোতালেব মালিকের নেতৃত্বে গভর্নর হাউজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছে। বৈঠকটির কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনী ভবনটিতে বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
বৈঠক শুরু হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর, দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর চারটি মিগ-২১ যুদ্ধবিমান গভর্নর হাউজে হামলা চালায়। এর কিছুক্ষণ পর আরও দুটি মিগ ও দুটি হান্টার যুদ্ধবিমান হামলায় যোগ দেয় এবং ভবনটি তখন ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
ওই হামলার কিছুক্ষণ পর এ. এম. মালিক ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদত্যাগ করেন। মুনতাসীর মামুন তার বইয়ে লিখেছেন, সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমান হামলায় গভর্নর হাউজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে অবশ্য গভর্নর হাউজের আরও সংস্কার করা হয়।
গভর্নর হাউজ থেকে আজকের ‘বঙ্গভবন’
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে ভবনটির পরিচয়ও আবার বদলে যায়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে এবং এক সপ্তাহ পর, ২৩ ডিসেম্বর, তৎকালীন গভর্নর হাউজে মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে।
ওই সভায়ই এর নামকরণ হয় ‘বঙ্গভবন’ এবং এটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বাসস্থান ও কার্যালয় হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে বঙ্গভবন।
তারপর থেকে রাষ্ট্রপতির শপথ, সরকার গঠন, রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের অভ্যর্থনাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ঘটনার সাক্ষী এই ভবন।