প্রকাশিত : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ৮:৪২:২৪
পিঠে বাঁধা ছোট্ট শিশু, হাতে উন্মুক্ত তলোয়ার, আর যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে চলা এক সাদা ঘোড়া। ইতিহাসের পাতায় চিত্রকল্পটি ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মনে সাহসের প্রতীক হয়ে আছে। সে ছবি আর কারো নয়, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিকন্যা—ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে যখন বাঘা বাঘা দেশীয় রাজারা ব্রিটিশদের ভয়ে তটস্থ কিংবা আপসকামী। তখন ২৯ বছর বয়সি এক বিধবা নারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।
মনিকর্ণিকা থেকে রানি লক্ষ্মীবাঈ
১৮২৮ সালের ১৯ নভেম্বর ভারতের বারাণসীর এক মারাঠা ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেন মনিকর্ণিকা তাম্বে, আদর করে যাকে ডাকা হতো ‘মনু’ বা ‘ছাবিলি’ নামে। ছোটবেলা থেকেই মনু ছিলেন অন্য দশটা সাধারণ মেয়ের চেয়ে আলাদা। পুতুল খেলার বয়সে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন তলোয়ার। প্রশিক্ষক ও যোদ্ধা নানা সাহেব এবং তাঁতিয়া টোপির সঙ্গে বড় হওয়া মনু শিখেছিলেন ঘোড়সওয়ারি, তলোয়ারবাজি আর মল্লযুদ্ধ।
১৮৪২ সালে ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয় এবং তিনি পরিচিত হন ‘রানি লক্ষ্মীবাঈ’ নামে। কিন্তু নিয়তি তার জন্য সুখের বাসর সাজায়নি। বিয়ের কিছুকাল পরেই নিজের নবজাতক সন্তানকে হারান এবং ১৮৫৩ সালে রাজা গঙ্গাধর রাও মারা যান। মৃত্যুর আগে রাজা নিজের ভাইয়ের ছেলে দামোদর রাওকে দত্তক নিয়েছিলেন।
স্বত্ববিলোপ নীতি ও লক্ষ্মীবাঈ
ব্রিটিশ লর্ড ডালহৌসি তার কুখ্যাত ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ শুরু করেন ভারতজুড়ে। ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই নীতি কার্যকর ছিল। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো রাজার নিজস্ব পুত্রসন্তান না থাকলে তার রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। দত্তক পুত্র রাজ্যের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। ব্রিটিশরা দামোদর রাওকে উত্তরাধিকারী মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং লক্ষ্মীবাঈকে সামান্য ভাতার বিনিময়ে ঝাঁসি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
তবে ব্রিটিশ দূতের মুখের ওপর লক্ষ্মীবাঈ দৃপ্ত কণ্ঠে সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি করেছিলেন— ‘ম্যায় মেরি ঝাঁসি নেহি দুঙ্গি’ (আমি আমার ঝাঁসি দেব না)। এখান থেকেই শুরু হয় এক মহাকাব্যিক লড়াই।
১৮৫৭-এর বিদ্রোহে লক্ষ্মীবাঈ
১৮৫৭ সালে মিরাট ও দিল্লিতে সিপাহী বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলে ঝাঁসিতেও তার আঁচ লাগে। ব্রিটিশরা যখন ঝাঁসি আক্রমণ করে, রানি তখন দুর্গের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। তিনি কেবল রানি ছিলেন না, ছিলেন দক্ষ সেনাপতি। তিনি নারীদের নিয়ে একটি আলাদা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, যারা রানির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিল।
টানা দুই সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ সেনাপতি হিউজ রোজ ঝাঁসি দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। কামানের গোলা আর বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঝাঁসিতে রানি হার মানেননি। অবশেষে যখন দুর্গ রক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন এক অবিশ্বাস্য সাহসিকতায় রানি তার দত্তক পুত্র দামোদরকে পিঠে বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে দুর্গ প্রাচীর থেকে লাফ দেন এবং রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ বেষ্টনী ভেদ করে পালিয়ে যান।
শেষ যুদ্ধ ও আত্মাহুতি
ঝাঁসি হাতছাড়া হওয়ার পর রানি কাল্পিতে যান। সেখানে তাঁতিয়া টোপির সঙ্গে মিলিত হয়ে গয়ালিয়র দুর্গ দখল করেন। ১৮৫৮ সালের ১৮ জুন, গয়ালিয়রের কোটা-কি-সরাই নামক স্থানে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে রানির সম্মুখ যুদ্ধ হয়। রানি লক্ষ্মীবাঈ পুরুষের বেশে, দুই হাতে তলোয়ার চালিয়ে ব্রিটিশ বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর আহত হন। কথিত আছে, তিনি মৃত্যুর আগে তার অনুগতদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার মরদেহ যেন কোনোভাবেই ব্রিটিশরা স্পর্শ করতে না পারে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রেই এক সাধুর কুটিরে দ্রুত তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
রানি লক্ষ্মীবাই যখন শহীদ হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর। তার মৃত্যুসংবাদ শুনে রানিকে পরাজিত করা ব্রিটিশ সেনাপতি হিউজ রোজ শ্রদ্ধাভরে বলেছিলেন— ‘এখানে সেই নারী ঘুমিয়ে আছেন, যিনি ছিলেন বিদ্রোহীদের মধ্যে একমাত্র পুরুষ’ (The only man among the rebels)।
ভারতীয় কবি সুভদ্রা কুমারী চৌহানের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন ‘খুব লড়ি মর্দানি ও তো ঝাঁসি ওয়ালি রানি থি’— আজও বিদ্রোহীদের রক্তে দোলা দেয়। যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইতিহাস লেখা হবে, ততদিন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই থাকবেন সেই ইতিহাসের প্রথম সারিতে, জ্বলন্ত নক্ষত্র হয়ে।