দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জুনের মধ্যে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। মঙ্গলবার (৭ মার্চ) বিকেলে নাগরিক প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে ইপিআইয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর সাজ্জাদ শাহরিয়ার এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
সারাদেশে এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে মারা গেছেন ১২৮ জন। এদের মধ্যে ২১ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে হামকে শনাক্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে ‘অ্যাক্টিভ ক্যাম্পেইন’ বন্ধ থাকায় টিকাদান কভারেজে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সাধারণত শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হামের এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকার দুই ডোজ দেওয়া হয়।
আগে যারা টিকাকেন্দ্রে যেতে পারত না, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া হতো। তবে সম্প্রতি ৬ মাস বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়ায় এবার ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।
সাজ্জাদ শাহরিয়ার জানান, ২০২০ সালের পর বিভিন্ন বাস্তবতায় নিয়মিত ক্যাম্পেইন ব্যাহত হয়। প্রতি চার বছর পরপর যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হওয়ার কথা, তা ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গত বছর এইচপিভি টিকাদান কার্যক্রমের কারণে করা সম্ভব হয়নি। ফলে ১৯ এপ্রিল জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ৫ এপ্রিল থেকেই জরুরি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি এলাকায় টিকাদান শুরু হবে। এরপর ৩ মে থেকে সারাদেশে একযোগে ক্যাম্পেইন চালানো হবে।’
ইপিআই সূত্র জানায়, বর্তমানে এমআর-১ কভারেজ ৮০ থেকে ৯২ শতাংশ এবং এমআর-২ প্রায় ৯০ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ায় এই সংখ্যা বড় আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে বৃহৎ পরিসরে ক্যাম্পেইন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডেপুটি ডিরেক্টর বলেন, ‘এই কর্মসূচিতে শিশু আগে দুই ডোজ টিকা নিয়ে থাকুক বা না থাকুক, সবাইকে অতিরিক্ত একটি ডোজ দেওয়া হবে। এটি সাপ্লিমেন্টারি ডোজ, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।’
তিনি বলেন, ‘১০ বছর পর্যন্ত দেওয়া গেলে আরও ভালো হতো। তবে আমাদেরকে গ্যাভির মাধ্যমেই টীকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে ফলে অতিরিক্ত টিকা সংগ্রহ করতে গেলে আরও অনেক অর্থের প্রয়োজন হবে। তাই আশু প্রতিকার এবং বাজেটের বিষয়টি মাথায় রেখে ৫ বছরের নিচের শিশুদের এবার এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ৩০টি উপজেলায় ১২ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্য থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে প্রায় দুই কোটি শিশুকে আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভ্যাকসিন সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশের কোল্ড চেইন ব্যবস্থা এখন শক্তিশালী। কোভিড-১৯ মহামারির সময় গড়ে ওঠা অবকাঠামোর কারণে ভ্যাকসিন নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ সম্ভব।’
এদিকে, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছে, যা রোগের তীব্রতা কমাতে কার্যকর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছর সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব থাকা ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান টিকাদান কভারেজে হোঁচটের কথা স্বীকার করে এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘গত বছর হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্টরা তিন দফায় কর্মবিরতি পালন করেন, যা টিকাদান কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলে। অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক স্বাস্থ্য সহকারীর চাকরি চলে যায়। পরে মাত্র ২৩ জেলায় সীমিত সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় পদগুলো এখনও শূন্য রয়েছে। এতে মাঠ পর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া টিকা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও জটিলতাও সার্বিকভাবে টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।’
বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘অপারেশনাল কাঠামো পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্য খাতে বাস্তবায়ন ও অর্থায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ ইতিবাচক পদক্ষেপ।’
তিনি জানান, হামের চিকিৎসা মূলত সহায়ক—জ্বর নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা। তবে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে অনেক রোগীকে ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে, যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তবে ব্যবস্থাপনার কোন ঘাটতি আপাতত নেই জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন সংসদে জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ক্যাম্পেইন না হওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। তিনি জানান, প্রথম ধাপে ১৮টি জেলা ও ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ৫ বছরের কম বয়সী ১২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রথম দিনেই প্রায় ৯৬ শতাংশ অর্জন হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। অতিরিক্ত টিকা সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ‘হামের মতো রোগ প্রতিরোধে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু গত বছর তা ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকিতে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে বড় উদ্বেগ হলো—টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই শিশুদের আক্রান্ত হওয়া। এটি কেন ঘটছে, তা জানতে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ জরুরি।’