৮ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক থ্যালাসেমিয়া দিবস। আন্তর্জাতিক থ্যালাসেমিয়া দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য—‘আর আড়ালে নয়: নতুনের রোগ নির্ণয়ে, মিলবে সেবা নিশ্চয়।’
থ্যালাসেমিয়া কী
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ, যা মূলত হিমোগ্লোবিন তৈরির জিনের ত্রুটির কারণে ঘটে। হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন বহন করে।
এই রোগে হিমোগ্লোবিনের আলফা (α) বা বিটা (β) গ্লোবিন চেইন তৈরিতে সমস্যা হয়। ফলে—
এর ফলস্বরূপ রোগীর শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
থ্যালাসেমিয়া অটোসোমাল রিসেসিভ হওয়ায়, রোগটি প্রকাশ পেতে হলে শিশুর বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকেই ত্রুটিপূর্ণ জিন উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে হয়। যদি একজন ব্যক্তি শুধুমাত্র এক কপি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেন, তবে তিনি ক্যারিয়ার (বাহক) হিসেবে পরিচিত থাকেন এবং সাধারণত লক্ষণবিহীন থাকেন। কিন্তু দুইজন ক্যারিয়ার বিয়ে করলে সন্তানের মধ্যে রোগ প্রকাশের ঝুঁকি থাকে ।
দম্পতি-দুজনেই যখন বাহক হয় তখন থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্মের আশঙ্কা ২৫ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ বাহক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সহজ বৈজ্ঞানিক সত্যটি এখনো সমাজে সাধারণ মানুষের অজানা।
রোগের তীব্রতার ধরন
থ্যালাসেমিয়ার তীব্রতা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে:
থ্যালাসেমিয়ার পরিসংখ্যান
বিশ্বব্যাপী মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ৫ থেকে ৭ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া জিনের বাহক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়া ও হিমোগ্লোবিন-ই রোগের বাহক, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক প্রায় ৬০ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যা জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করে।
থ্যালাসেমিয়া রোগের এই উচ্চ প্রবণতার কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়—
রোগের লক্ষণ
থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ সাধারণত শিশু বয়সেই প্রকাশ পায়:
কীভাবে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা যায়
বিশেষ রক্ত পরীক্ষার (এইচবি ইলেক্ট্রোফোরেসিস) মাধ্যমে জেনে নিন আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। বাহক হলে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন আপনার জীবন সঙ্গী/সঙ্গিনী থ্যালাসেমিয়ার বাহক না হয়। এভাবে সচেতনার মাধ্যমে একজন বাহকের সঙ্গে আরেকজন বাহকের বিয়ে এড়িয়ে থ্যালাসেমিয়া-আক্রান্ত সন্তান জন্ম দেওয়া রোধ করা সম্ভব।
এছাড়া ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থাৎ স্বামী ও স্ত্রী দুজনই এ রোগের বাহক হলে, অথবা যাদের এক বা একাধিক থ্যালাসেমিক শিশু আছে তারা গর্ভস্থ ভ্রুণ পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য থ্যালাসেমিয়া শিশু নির্ণয় এবং তা পরিহার (গর্ভপাত) করতে পারেন। গর্ভাবস্থার ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষাটি করালে ভালো হয়।
তাছাড়া নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা
থ্যালাসেমিয়া মানেই সবসময় রক্ত দেওয়া নয়। প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে রোগী রক্তসঞ্চালন-নির্ভর কি না। অন্তত ২ সপ্তাহের ব্যবধানে দুইবার এইচবি পরীক্ষা করে যদি তা ৭.০ গ্রাম/ডিএল-এর নিচে থাকে বা না বাড়ে, তখন রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। রক্ত দেওয়ার আগে হেপাটাইটিস ‘বি’ পরীক্ষা ও টিকা নেওয়া জরুরি। সম্ভব হলে লিউকো-ডেপলেটেড (Leuco-depleted_ রক্ত ব্যবহার করা ভালো।
বারবার রক্ত নেওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। তাই চিলেশন থেরাপি (Deferoxamine, Deferasirox, Deferiprone) দিয়ে অতিরিক্ত আয়রন অপসারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে হাইড্রোক্সিউরিয়া ও থ্যালিডোমাইড ব্যবহৃত হয়, আর নির্বাচিত রোগীতে Splenectomy করা যেতে পারে—তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।
থ্যালাসেমিয়ার স্থায়ী চিকিৎসার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হলো ডোনার প্রাপ্তি সাপেক্ষে আ্যলোজেনিক অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone Marrow Transplant)। এটিই থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করতে পারে, তবে ঝুঁকি ও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি উপযুক্ত ডোনার পাওয়া না যায়, তাহলে জিন থেরাপি বা জিন এডিটিং একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প। তবে এই চিকিৎসা এখনো গবেষণা পর্যায়ে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়।
বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও সীমিত, তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সর্বোপরি, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপই সমাজকে এই রোগের বোঝা কমাতে সাহায্য করতে পারে।