আদ্-দ্বীনের ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ মানবিক অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনায় এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়; বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার ফল।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অনেকেই অতীতের বিভিন্ন হাসপাতাল দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন। কিন্তু ইউনাইটেড হাসপাতাল কিংবা বার্ন ইউনিটের দুর্ঘটনা ছিল বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনা, অন্যদিকে আদ্-দ্বীনের ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ মানবিক অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার ফল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার সময় নবজাতকদের রাখা কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কক্ষটি ছিল সম্পূর্ণ বদ্ধ, সেখানে জানালা ছিল না, পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রবাহের ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে শিশুরা কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে সৃষ্ট শ্বাসরোধজনিত পরিস্থিতিতে (হাইপারক্যাপনিয়া) ছটফট করতে করতে মারা যায়।’
তিনি জানান, ঘটনার সময় ১৬-১৭ জন মা আতঙ্কিত হয়ে সাহায্যের জন্য ছুটাছুটি করলেও কোনো চিকিৎসক দ্রুত সেখানে উপস্থিত হননি। পরে তিনি নিজে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তারা স্বীকার করেন যে, অক্সিজেনের অভাব ও অবহেলার কারণেই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কি বসে থাকব? আমরা দেশের সব হাসপাতালকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চাই। মানুষের জীবন নিয়ে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।’
মন্ত্রী জানান, হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে তিনি আরও দেখতে পান, হাসপাতাল ভবনের ভেতরেই একটি বেকারি পরিচালিত হচ্ছিল। সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অগ্নি-নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি ছিল।
তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে আগুন লাগলে কোনো রোগী, স্বজন বা স্বাস্থ্যকর্মীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতো না।’
মন্ত্রী অভিযোগ করেন, ‘ঘটনার পরও হাসপাতালের মালিক ঘটনাস্থলে যাননি। বরং প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিবর্তন এনে নিজের স্ত্রীকে প্রধান নির্বাহী করা হয়েছে। নিহত শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মাথা কাটতে বলিনি, আমরা শুধু লাইসেন্স স্থগিত করেছি। তদন্ত চলছে, সরকার সবকিছু দেখবে। কিন্তু এ ঘটনাকে দলীয় রাজনীতির বিষয় বানানো উচিত নয়।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের কাছে সবার আগে বাংলাদেশ এবং দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য। তাই স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলা, গাফিলতি কিংবা দায়িত্বহীনতার কোনো স্থান নেই। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় মানবিক ভুল ও চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করেছে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।’
বাজেট প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে মানুষের কল্যাণের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে একাধিক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাজেটে হেলথ কার্ড চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা হবে। এছাড়া এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
মন্ত্রী জানান, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল, বিশেষ করে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই)-এর ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্যান্সার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন ব্যয়বহুল চিকিৎসা-উপকরণের ওপর কর হ্রাস করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের আউট অব পকেট এক্সপেন্স বা নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
তিনি বলেন, ‘এই বাজেট শুধু সংখ্যার বাজেট নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুণগত বাজেট।’
সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, জনগণের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’