উদ্বোধনের ২২ দিন পার হলেও এখনো চালু করা যায়নি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে নতুন এনজিওগ্রাম মেশিন। স্থাপনের কাজ অসম্পূর্ণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতি থাকায় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শত শত রোগী।
জানা গেছে, গত ১২ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম মেশিনটির উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের ২২ দিন পার হলেও এনজিওগ্রাম মেশিনটি পুরোপুরি স্থাপন কাজ শেষ হয়নি। ঢাকা থেকে আসা একটি কারিগরি দল কাজ তদারকি করলেও মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আনা মেশিনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এখনো এসে পৌঁছায়নি।
সূত্র বলছে, মূলত অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতার কারণেও মেশিনটি চালু করা সম্ভব হয়নি। মেশিনটির সঙ্গে থাকা ১০টি রেডিয়েশন প্রটেক্টিভ অ্যাপ্রনও সরবরাহ করা হয়নি। ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে মেশিন চালু করা যাচ্ছে না। মেশিনটি মেরামত ও চালু করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ নতুন মেশিন হাসপাতালে এলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও রেডিয়েশন প্রটেক্টিভ অ্যাপ্রনের অভাবে তা এখনো অচল অবস্থায় রয়েছে। এতে কবে নাগাদ এনজিওগ্রাম সেবা শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গতকাল (সোমবার) হৃদরোগ বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীর চাপ এত বেশি যে ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেক রোগী মেঝেতেই শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন নিজ এলাকা মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে দুটি এনজিওগ্রাম মেশিন বরাদ্দ দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত মেশিন দুটি বাক্সবন্দি ছিল। পরে একটি মেশিন চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে পাঠানোর পর থেকেই স্থাপন ও ব্যবহার নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যেই পুরোপুরি স্থাপন শেষ না হতেই মেশিনটির উদ্বোধন করা হয়।
চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগ সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছর ধরে জাপানের শিমাডজু ব্র্যান্ডের একটি এনজিওগ্রাম মেশিন দিয়ে করোনারি, পেরিফেরাল এনজিওগ্রাম এবং রিং (স্টেন্ট) স্থাপনের কাজ চলছে। দৈনিক শতাধিক রোগীর এনজিওগ্রামের চাহিদা থাকলেও একমাত্র কার্যকর মেশিনে দিনে সর্বোচ্চ ১০ জন রোগীর পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। বাকিদের কয়েক গুণ বেশি খরচে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
এ ছাড়া চমেকে এনজিওগ্রামের সিরিয়াল পেতে তদবির ও উৎকোচের অভিযোগও রয়েছে। তবু সাধারণ ও হতদরিদ্র রোগীরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করে যাচ্ছেন। ২০২১ সালের শেষ দিকে আরেকটি এনজিওগ্রাম মেশিনের পিকচার টিউব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেটিও এখনো বিকল পড়ে আছে।
চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে শয্যা সংকট এখন নিয়মিত চিত্র। ১৬০ শয্যার এই বিভাগে অনেক সময় ২৫০ জন পর্যন্ত রোগী ভর্তি থাকেন। বিপুল এই রোগীর চাপ সামাল দিতে বর্তমানে মাত্র একটি ক্যাথল্যাব ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই ক্যাথল্যাব দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ জনের এনজিওগ্রাম, ২ থেকে ৩ জনের হৃদরোগে রিং স্থাপন এবং সপ্তাহে এক থেকে দুজন রোগীর পেসমেকার বসানো হয়।
যদিও হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে দুটি ক্যাথল্যাব রয়েছে, এর মধ্যে একটি ২০২২ সাল থেকেই বিকল হয়ে পড়ে আছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে একটিমাত্র ক্যাথল্যাব দিয়েই পুরো বিভাগের চিকিৎসা সেবা চালাতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যবহারের চাপ সামলাতে গিয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সচল ক্যাথল্যাবটিতেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, যার কারণে টানা পাঁচ দিন বন্ধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিকল হয়ে যাওয়া ক্যাথল্যাবটির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সার্ভিস সময় ইতোমধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটি মেরামত করতে প্রায় ৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই ব্যয় এড়াতে কর্তৃপক্ষ বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অব্যবহৃত ক্যাথল্যাব চমেকে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন ক্যাথল্যাবটি পুরোপুরি স্থাপন ও চালু করা গেলে হৃদরোগ বিভাগের সেবার পরিধি বাড়বে এবং রোগী ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমবে, এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, নতুন ক্যাথল্যাবটি পুরোপুরি স্থাপন ও চালু করা গেলে এই বিভাগের সেবার পরিধি বাড়বে এবং রোগীভোগান্তি কিছুটা হলেও কমবে। এতে চট্টগ্রাম বিভাগসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের কয়েক লাখ সাধারণ ও গরিব মানুষ উপকৃত হবেন। বিশেষ করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রামে হৃদরোগের প্রকোপ বেশি হওয়ায় এই সেবাটি দ্রুত চালু করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।