বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আলোচিত দুই উপপরিচালক সঞ্জিব কুমার সিংহ ও এসএম আফজাল রেজার বদলি নিয়ে যেন নাটকীয়তা থামছেই না। একের পর এক ঘটছে নাটকীয় বদলি। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও বিটিআরসির ওই দুই উপ-পরিচালককে ফের বদলি করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃপক্ষ।
রোববার (১৯ এপ্রিল) বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) জারি করা এক অফিস আদেশে উপপরিচালক সঞ্জিব কুমার সিংহকে এনফোর্সমেন্ট এন্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট থেকে প্রশাসন বিভাগে ও এসএম আফজাল রেজাকে স্পেকট্রাম বিভাগ থেকে প্রশাসন বিভাগে বদলি করা হয়েছে।
এর আগে, ৩১ মার্চ এক অফিস আদেশে বিটিআরসির পরিচালক আফতাব মো. রাশেদুল ওয়াদুদ, মো. ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া, উপ-পরিচালক বেগম শারমিন সুলতানা, সনজিব কুমার সিংহ ও এসএম আফজালকে বদলি করা হয়।
এর মধ্যে উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহ ও এসএম আফজালকে শাস্তিমূলকভাবে বদলি এবং পদক্রমের নিম্ন পর্যায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বদলির আদেশটি জারি হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য। এর আগেও উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহকে গত এক বছরে হয়রানির উদ্দেশ্যে একাধিকবার বিভিন্ন বিভাগ ও শাখায় বদলি করা হয়।
পরে ৩১ মার্চ জারি করা অফিস আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন উপপরিচালক সঞ্জিব কুমার সিংহ ও এসএম আফজাল রেজা। রিটে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রন কমিশনের (বিটিআরসি) ওই দুই উপ-পরিচালককে অন্যায় ও বিধিবহির্ভূতভাবে ঢাকার বাইরে বদলির আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে হাইকোর্ট বিভাগ ওই বদলির আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে বলে নাগরিক প্রতিদিনকে নিশ্চিত করেছিলেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান।
জানা যায়, বিটিআরসিতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জন জুনিয়র পরামর্শককে রাজস্ব খাতের বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং ওই সব কর্মকর্তাদের তাড়াহুড়ো করে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট পিটিশনের বাদী বিটিআরসির ছয়জন উপ-পরিচালক।
উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়েরের পর পরই ওই ছয়জন উপ-পরিচালকের মধ্যে দুই উপ-পরিচালক সঞ্জিব কুমার সিংহ ও এসএম আফজাল রেজাকে ঢাকার বাইরে বদলি করার ঘটনায় বিটিআরসিতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। বিভিন্ন পত্রিকায় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ওই দুইজন উপ-পরিচালককে বদলি করা হয়েছে মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ভুক্তভোগী দুই উপ-পরিচালক হাইকোর্টে উক্ত বদলির আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশন দায়ের করেন।
রিটে উল্লেখ করা হয়, ইতপূর্বে রিট পিটিশন দায়ের করার প্রেক্ষিতে তারা বিটিআরসিতে বিভিন্ন হয়রানির স্বীকার হয়ে আসছিলেন। বিটিআরসির বিভিন্ন বেআইনি নিয়োগের বিষয়ে প্রতিকার চাওয়ায় তারা উচ্চ মহলের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় অল্প সময়ের মধ্যে তাদের দুইজনকেই একাধিক বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এইবার তাদের ঢাকার বাইরে বেআইনিভাবে সরকারের অনুনোমোদিত সিলেট ও রংপুরে অবস্থিত মনিটরিং ষ্টেশনে বদলী করা হয়। তাদের যে অবস্থানে বদলি করা হয়েছে তা তাদের পদক্রমের নিম্ন পর্যায়ের দায়িত্ব। এ ছাড়া উপ-পরিচালক পদের কর্মকর্তাদের এই ধরনের বদলির আদেশ বিটিআরসির ইতিহাসে এবারই প্রথম।
বিটিআরসির প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম ও ২০০৮ সালে প্রণীত পদ সৃজন আদেশের কোথাও মনিটরিং ষ্টেশনে উপ-পরিচালক পদ বলে কিছুর উল্লেখ নেই। এ ছাড়া, যেহেতু বিটিআরসির আইন মেনে ঢাকার বাইরে সরকার অনুমোদিত বিটিআরসির কোন শাখা অফিস নেই সেহেতু কর্তৃপক্ষ ঐ স্থানে কোন পূর্ণকালীন বদলির আদেশ প্রদান করতে পারে না মর্মে রিটে উল্লেখ করা হয়।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) রিট শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জনাব আকরাম হোসেন চৌধুরী ও বিচারপতি জনাব এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ বিটিআরসির মানব সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক স্বাক্ষরিত ৩১ মার্চ ও ২ এপ্রিলের বদলির আদেশ কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এ ছাড়া হাইকোর্ট উক্ত ১৬ অক্টোবর ও ১৪ ডিসেম্বরের বদলির আদেশের কার্যকারিতা আগামী দুই মাসের জন্য স্থগিতের আদেশ দেন।
রিট পিটিশনে বিবাদী করা হয়েছে যথাক্রমে, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অডিট উইং-এর যুগ্ম পরিচালক, বিটিআরসির চেয়ারম্যান, প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক, প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ও মানব সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালককে। আদালতে রিট পিটিশনের পক্ষে শুনানী করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান।
উল্লেখ্য, বিটিআরসিতে কর্মরত ছয়জন উপ-পরিচালক যথাক্রমে সঞ্জিব কুমার সিংহ, কাজী মো. আহসানুল হাবীব, মো. জাকির হোসেন খান, এসএম আফজাল রেজা, মোঃ আসিফ ওয়াহিদ, মোঃ হাসিবুল কবির বিটিআরসিতে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এবং সিরিয়াস ফিন্যানসিয়াল ইরেগুল্যাটোরি (এসএফআই) তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পদোন্নতি প্রদানের প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জনাব রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি জনাব মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ গত ৫ মার্চ শুনানি শেষে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের পাঠানো গত ১৬ অক্টোবর ও ১৪ ডিসেম্বরের চিঠি অনুসারে কেন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে এবং একই সঙ্গে সিরিয়াস ফিন্যানসিয়াল ইরেগুল্যাটোরি (এসএফআই) তালিকাভুক্ত প্রার্থীদের পদোন্নতির জন্য গত ৩ নভেম্বর গঠিত ডিপিসির কার্যক্রম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তাও জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।