দীর্ঘকাল ধরে একটি অলিখিত নিয়ম চলে আসছে যে, জন্মনিয়ন্ত্রণের সব ব্যবস্থা শুধু নারীদেরই। তারাই সামলাবেন যাবতীয় ঝক্কি আর শারীরিক ধকল। পিল খাওয়া থেকে শুরু করে ইনজেকশন বা ইমপ্ল্যান্ট, যাবতীয় পদ্ধতির জন্মনিয়ন্ত্রণ শুধু নারীদেরই। পুরুষদের জন্য কনডম বা স্থায়ী ভ্যাসেকটমি ছাড়া আর তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য ও সহজ পথ ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানের আশীর্বাদে সেই দৃশ্যপট এবার হয়তো বদলে যেতে চলেছে।
গবেষকরা পুরুষদের জন্য নিয়ে আসছেন এমন এক জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, যা কোনো হরমোন ছাড়াই কাজ করবে এবং যার কোনো দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। এই নতুন পিলের নাম দেওয়া হয়েছে ওয়াইসিটি-৫২৯। এই ম্যাজিক পিলটি নিয়ে বিপুল কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে চিকিৎসক মহলে।
এতদিন পুরুষদের পিল তৈরির যত চেষ্টা হয়েছে, তার বেশিরভাগই ছিল টেস্টোস্টেরন হরমোন নিয়ে। হরমোন নিয়ে কারসাজি করলে অনেক সময় মেজাজ খিটখিটে হওয়া, ওজন বেড়ে যাওয়া কিংবা অবসাদের মতো সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু ওয়াইসিটি-৫২৯ পিলটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে কাজ করে। এটি শরীরের স্বাভাবিক হরমোনে হাত না দিয়ে সরাসরি অণ্ডকোষের সেই বিশেষ রিসেপ্টরকে লক্ষ্য করে, যা ভিটামিন-এ থেকে শুক্রাণু তৈরির সংকেত দেয়। সহজভাবে বললে, এই পিলটি শুক্রাণু তৈরির ‘সুইচ’ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়, কিন্তু শরীরের অন্যান্য পুরুষালি বৈশিষ্ট্যে কোনো প্রভাব ফেলে না।
সম্প্রতি ‘কমিউনিকেশনস মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানীদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। ১৬ জন সুস্থ পুরুষের ওপর চালানো প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ওষুধটি মানুষের শরীর খুব সহজেই গ্রহণ করছে। বড় কোনো শারীরিক সমস্যা ছাড়াই এটি শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে আনতে সক্ষম।
গবেষকরা বলছেন, দিনে মাত্র একটি পিল খেয়েই একজন পুরুষ জন্মনিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন। রক্তে এই ওষুধের উপস্থিতির সময়কাল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি নিয়মিত খাওয়ার জন্য অত্যন্ত নিরাপদ।
অনেকের মনেই ভয় থাকে যে, একবার এমন ওষুধ খেলে পরে কি আর বাবা হওয়া সম্ভব? গবেষকরা এ বিষয়ে অভয় দিয়ে জানিয়েছেন, এই পিলটি শতভাগ রিভার্সিবল। অর্থাৎ, যতক্ষণ আপনি ওষুধটি খাবেন, ততক্ষণ এটি কার্যকর থাকবে। যখনই আপনি মনে করবেন সন্তান নিতে চান, ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেবেন। কিছুদিনের মধ্যেই শরীর আবার স্বাভাবিকভাবে শুক্রাণু তৈরি শুরু করবে। ল্যাবে ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, ওষুধ বন্ধ করার চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই তারা পুনরায় বাবা হওয়ার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে।
যদিও এই পিলটি জনসাধারণের জন্য বাজারে আসতে আরও কিছু বড় ধরনের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের প্রয়োজন, তবুও এর সম্ভাবনা বিশাল। আধুনিক বিশ্বে অনেক পুরুষই এখন জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সমানভাবে নিতে চান। এই পিলটি বাজারে এলে জন্মনিয়ন্ত্রণের পুরো বোঝা আর নারীর একার ওপর থাকবে না। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন নয়, বরং জেন্ডার সমতার পথেও এক বড় পদক্ষেপ। চিকিৎসকরা আশা করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো আমরা এমন এক সময় দেখব যখন দম্পতিরা আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করবেন যে এই মাসে কে পিল খাবেন, স্বামী না স্ত্রী!
সূত্র: দ্য অপটিমিস্ট ডেইলি