ইউএনবির প্রতিবেদন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বাকি দুই দিন। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা। এখন অপেক্ষা শুধুই ভোটগ্রহণের। এমন অন্তিম মুহূর্তে এসেও ভোটারদের একটি বড় অংশ সিদ্ধান্তহীন। ফলে এই ‘অনিশ্চিত’ ভোটাররাই কোনো প্রার্থী ও দলের পাল্লা ভারী করতে হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গত ১ থেকে ২০ জুলাই পরিচালিত দেশব্যাপী ভোটারদের মনোভাব জরিপে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ৪৮ শতাংশ ভোটার এখনো ঠিক করেননি কাকে ভোট দেবেন। আট মাস আগে এই হার ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। সে হিসেবে এই সময়ে এসে ভোটারদের অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা অনেকটাই কেটে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো।
সারা দেশের পাঁচ হাজার ৪৮৯ জন ভোটার এই জরিপে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ ছিলেন পুরুষ ভোটার, আর ৪৭ শতাংশ নারী। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারীদের ৭৩ শতাংশই গ্রামের বাসিন্দা, আর ২৭ শতাংশ ছিল শহরের।
‘বিআইজিডি পালস সার্ভে: জুলাই ২০২৫—নাগরিকদের ধারণা, প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক এ জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৪.৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে কিছু বলতে চান না; আর ১.৭ শতাংশ বলেছেন, তারা ভোটই দেবেন না। অর্থাৎ ভোটারদের সমর্থন আদায়ে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম, জনসমাবেশ, নানা প্রতিশ্রুতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা প্রচেষ্টার পরও প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন রয়েছেন।
সিদ্ধান্তহীন ভোটার গোষ্ঠী আসলে কত বড়?
শুধু বিআইজিডি পালস সার্ভেই নয়, নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়ে একাধিক জনমত জরিপে মিলেছে এই সিদ্ধান্তহীনতার চিত্র। ইনোভিশন কনসালটিংয়ের পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পিইপিএস রাউন্ড–৩) অনুযায়ী, কাকে ভোট দেবেন—এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভোটারদের মধ্যে দল হিসেবে বিএনপি সমর্থিত জোট সবচেয়ে এগিয়ে। ৫২.৮ শতাংশ ভোটার তাদের ভোট দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীদের ৩১ শতাংশ। তবে জরিপের ১৩.২ শতাংশ ভোটার কোনো দলীয় প্রার্থীকে পছন্দ করবেন কিনা, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন।
ইনোভিশন কনসালটিংয়ের এই জরিপের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট। ২২.২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন—এ বিষয়ে তারা এখনো কিছু বলতে পারছেন না। বিপরীতে ৪৭.৬ শতাংশ নির্দিষ্ট একজন নেতার নাম বলেছেন এবং ২২.৫ শতাংশ অন্য কাউকে বেছে নিয়েছেন।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা আরও বেশি। তরুণদের ওপর পরিচালিত ‘ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ ভোটার কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে অনিশ্চিত; প্রার্থী, প্রতীক বা দল পছন্দ করেছেন তুলনামূলক কম অংশ। ফলে সহজেই অনুমান করা যায়, এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী নন। এই ভোটব্যাংককে উপেক্ষা করে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ কষা সত্যিই কষ্টসাধ্য।
ভোটের মাঠের চিত্র
দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের দিকে এগোলেও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নেতাদের দেশত্যাগ ও কারাবাসের কারণে দলটির সমর্থক শুধু নয়, সাধারণ নিরপেক্ষ ভোটারদের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। আর এর প্রভাবে ভোটের মাঠের সমীকরণ বদলে গেছে অনেকখানি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একজন সরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দুই দল হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। এখন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তারা দীর্ঘদিনের মিত্র এবং আদর্শগতভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অভিন্ন। আওয়ামী লীগের মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতির কারণেই মূলত তারা এখন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে। আর এ বিষয়টির কারণেই এবারের নির্বাচন ভোটারদের চোখে ভিন্ন আঙ্গিকে ধরা পড়েছে।’
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে অংশগ্রহণের ঘাটতি ছিল, এবারেও তার অনেকটা রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার কথায় সমর্থন দিয়ে পাশে থাকা আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘যে কারণে ২০২৪ সালের নির্বাচন সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক ছিল না, একই কারণে এবারের নির্বাচনও পূর্ণ অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, কিন্তু তাদের ভোটব্যাংক কিন্তু নির্বাচনে ঠিকই বড় ফ্যাক্টর। আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের ভোটারদের একটা বড় অংশই ভোটকেন্দ্রে যাবে না বলে আমার বিশ্বাস।’
অন্যদিকে গণভোট নিয়ে সংশয়ও ভোটারদের ভোটে অনীহা প্রকাশের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন রফিকুল আলম নামের এক ব্যক্তি। এই বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, ‘গণভোটের কিছু ইতিবাচক দিক আছে, যা ভবিষ্যৎ সরকারকে আরও জবাবদিহির মধ্যে রাখবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এ বিষয়টি সমস্যাজনক।’
তার ভাষ্য, ‘অনেকগুলো শর্ত একসঙ্গে উপস্থাপন করে ভোটারদের শুধু হ্যাঁ বা না বলতে বলা হচ্ছে। শর্তগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটিতে কেউ কেউ সমর্থন দেবেন, আবার কোনো কোনোটি হয়তো তার মতের সঙ্গে মিলবে না। কিন্তু হ্যাঁ ভোট দিলে সবগুলোতে সমর্থন দিতে হবে, আবার না বললে সবগুলো শর্তের বিরোধিতা করা হবে। এই অবস্থা ভোটারদের চরম দ্বিধায় ফেলেছে। আর এর প্রভাব পড়তে পারে ভোটের দিন। অনেকে হয়তো এই দ্বিধার কারণেই ভোট দিতে যাবেন না।’
গণভোট নিয়ে দ্বিধার কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাও। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ নিরক্ষর এবং অনেক ভোটারই গণভোট ঠিক কী নিয়ে হচ্ছে, সেটাই ঠিক করে জানেন না। প্রশ্নগুলোই যদি বোঝাই না যায়, তাহলে সেই ভোট কতটা অর্থবহ হয়?’
সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের ব্যাপারে হতাশার কথাই জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে খুব বেশি প্রত্যাশা নেই। ভোট দেব, তবে এবার আমার ভোটটা হবে যাকে আমি তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করি এবং যারা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার পক্ষে।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, তিনি ভোট দেবেন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের কোনো প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সামান্য অংশও বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝখান থেকে একটি গোষ্ঠী ব্যাপক লাভবান হয়েছে। এই নির্বাচনের পরও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’
এবারের নির্বাচনে নতুন প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে, আর তা হচ্ছে পোস্টাল ব্যালট, অর্থাৎ ডাকযোগে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি। আধুনিক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান কর্মরত ব্যক্তি, কারাবন্দি, এমনকি দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটাররাও নিজের প্রার্থীকে সমর্থনের সুযোগ পাচ্ছেন।
নতুন এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে শুরুতে উদ্দীপনা লক্ষ করা গেলেও কার্যত তাদের তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি। পোস্টাল ভোটের ব্যাপারে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি সুমাইয়া জান্নাত বলেন, ‘আমি এটাকে সত্যিকারের নির্বাচন মনে করি না। আমার কাছে এটা জনগণকে দেওয়া একধরনের সান্ত্বনা পুরস্কার বলেই মনে হয়।’
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আরেক ভোটার কাশপিয়া বাঁধন বলেন, ‘এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আমার দল এবারের নির্বাচনে নেই। তাই আমি ভোট দিচ্ছি না।’
তিনি বলেন, ‘শুধু আমি নই, আমার পুরো পরিবারই সেই দলকে সমর্থন করে। আমি যদি বাংলাদেশে থাকতাম, তাহলে ভয়ে হোক আর সামাজিক চাপে, আমাকে হয়তো ভোটকেন্দ্রে যেতে হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় আমার আর সেই বাধ্যবাধকতা নেই।’
তাই আওয়ামী লীগের ভোটের মাঠে না থাকা, গণভোটের জটিলতা—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের একটা বড় অংশের অংশগ্রহণ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণত ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসে, ভোটারদের মাঝে অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা ততই কমে আসে। কিন্তু এবারের নির্বাচন ভিন্ন। আওয়ামী লীগের মতো প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিই ভোটের মাঠের প্রতিযোগিতার চিত্র বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে। দলীয় সমর্থকদের বাইরে নিরপেক্ষ ভোটাররাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে ইনোভিশনের এ বিষয়ে করা জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৯.৫ শতাংশ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে থাকলেও ১২ শতাংশ গণভোট প্রশ্নে সিদ্ধাহীনতায় ভুগছেন।
জরিপগুলো থেকে আরও দেখা যায়, অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সময়মতো নির্বাচন—এসব বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা রাজনৈতিক বয়ান আর প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব সমস্যা নিয়েই বেশি ভাবছেন।
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারে আস্থা
অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নানা প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা ও জল্পনা-কল্পনা হলেও নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আস্থার ইঙ্গিত মিলেছে।
পিইপিএস রাউন্ড–৩: আস্থা সূচক জরিপে দেখা গেছে, ৭২.৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে। অংশগ্রহণকারীদের ৮২.৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন, তারা ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন। এ থেকে বোঝা যায়, অনেক ভোটার ভোটদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীন থাকলেও ভোটের সুষ্ঠু আয়োজন নিয়ে তাদের মধ্যে আস্থা রয়েছে।
শেষ সময়ের হিসাব
সার্বিক দিক বিবেচনায়, তাই একেবারে অন্তিম সময়ে এসে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে নির্বাচনের ফল নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মোট ভোটারদের বিরাট এই অংশ যদি ভোটকেন্দ্রে না যায়, তাহলে সমীকরণ একরকম হবে, আর তারা ভোট দিলে কে কোন প্রার্থী বেছে নেবেন, তার ওপর ফলাফলের অনেকটা নির্ভর করবে।
তাই প্রার্থীরা এই শ্রেণিকে কতটা নিজেদের দিকে টানতে পারবেন, কিংবা আদৌ পারবেন কিনা—শেষ সময়ে তা-ই হয়ে উঠেছে আলোচনা ও জল্পনার অন্যতম কেন্দ্র। তবে শেষ পর্যন্ত এই শ্রেণির ভোটাররা প্রতিটি আসনের ফল নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখেন, তা দেখতে সবার নজর এখন ১২ তারিখের ভোটে।