অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ বা এদের ‘মৃত্যু’ হবে কি না, এটি বর্তমানে বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর দেশবাসীর মনে এ নিয়ে বিপুল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি কোনো অধ্যাদেশ জারি করলে, সংসদ পুনর্গঠিত হওয়ার পর তার প্রথম বৈঠকেই ওই অধ্যাদেশটি উপস্থাপিত হতে হবে। উল্লেখ্য, সংসদ বসতে যাচ্ছে আগামী ১২ মার্চ।
সংসদ বসার পর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের (সাধারণত ৩০ দিন) মধ্যে যদি সেই অধ্যাদেশটি সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত বা ‘আইনে’ রূপান্তরিত না হয়, তবে এর কার্যকারিতা লোপ পায় বা ‘মৃত্যু’ ঘটে।
অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নবনির্বাচিত সংসদ যদি এই অধ্যাদেশগুলোকে সমর্থন না করে বা পাস না করে, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ ও বৈধতার সংকট
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শরীফ ভূঁইয়া বা ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা আসে মূলত ‘বিপ্লবী সরকার’ বা ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ (প্রয়োজনীয়তার নীতি) থেকে। যেহেতু এই সরকারটি সংবিধানের কোনো নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদের (যেমন- তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আওতায় গঠিত হয়নি, তাই তাদের অধ্যাদেশগুলো কেবল তখনই স্থায়ী রূপ পাবে যখন আগামী সংসদ সেগুলোকে ‘ইনডেমনিটি’ (দায়মুক্তি) বা ‘রেটিফিকেশন’ (বৈধতা দান) প্রদান করবে।
‘জুলাই সনদ’ ও ২০২৬-এর গণভোট
২০২৫-২৬ সালের প্রেক্ষাপটে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের কাজের বৈধতা কেবল সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়নি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়া সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে অনেক মৌলিক সংস্কারের ‘জনসমর্থন’ আদায় করার চেষ্টাও করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ তাই মনে করেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকলে সংসদ চাইলেই এককভাবে কোনো অধ্যাদেশ বাতিল করতে পারবে না, কারণ সেটি তখন সরাসরি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিফলন হিসেবে গণ্য হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
অন্যান্য আইনজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশগুলোর স্থায়িত্ব নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। বিএনপির মতো বড় দলগুলো যদি মনে করে এই অধ্যাদেশগুলো তাদের জন্য ক্ষতিকর, তবে তারা সংসদে গিয়ে এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তবে এর বিপদ আছে। যদি নির্বাচন কমিশন গঠন বা বিচার বিভাগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো সংসদ অনুমোদন না করে, তবে গোটা গণতান্ত্রিক কাঠামো আবার ভেঙে পড়তে পারে। একে স্কলাররা ‘সংবিধানিক অচলাবস্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন অনেকে।
এমন পরিস্থিতিতে তিনটি ঘটনা ঘটতে পারে:
১. অধ্যাদেশগুলোর আইনি মৃত্যু: সংসদ পাস না করলে ৩০ দিন পর এগুলো তামাদি হয়ে যাবে।
২. ইনডেমনিটি: নতুন সংসদ একটি ‘লিগ্যাল ভ্যালিডেশন অ্যাক্ট’ পাস করে সব অধ্যাদেশকে একযোগে বৈধতা দিতে পারে (যেমনটি পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর ক্ষেত্রে হয়েছিল, যদিও পরে সেগুলো আদালত বাতিল করে)।
৩. জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্তি: নতুন যে সংবিধান সংশোধিত হবে, তাতে এই অধ্যাদেশগুলোকে সরাসরি সংবিধানে ঢুকিয়ে দেওয়া।
এখন দেশবাসী ১২ মার্চের সংসদ অধিবেশনের দিকে গভীর আগ্রহভরে তাকিয়ে আছেন যে নতুন সংসদ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিকে কীভাবে নেয় সেটি দেখার জন্য।