আল জাজিরার প্রতিবেদন
যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আর এই আলোচনার কেন্দ্রে অন্যতম প্রধান বিবাদের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের হাজার হাজার কোটি ডলারের সম্পদ।
বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু হয়ে আছে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটকে কেন্দ্র করে এই নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেও পরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের কারণে তা আরও কঠোর করা হয়।
এসব বিধিনিষেধের কারণে ইরান বিদেশে তাদের তেল বিক্রির অর্থসহ নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতা হারিয়েছে।
গত ১০ এপ্রিল প্রথম দফার শান্তি আলোচনার আগে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, যেকোনো আলোচনার আগে বিদেশে জব্দ থাকা এই অর্থ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে।
এর একদিন পরেই ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় গুঞ্জন ওঠে, ওয়াশিংটন অন্তত কিছু সম্পদ ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সেই খবর নাকচ করে জানায়, সম্পদগুলো এখনো জব্দ অবস্থাতেই আছে।
আগামী ২২ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই ইস্যুতে পুনরায় উত্তেজনা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কিন্তু ইরানের আসলে কত টাকা আটকে আছে? কেন তারা তা ব্যবহার করতে পারছে না? আর এই অর্থ বর্তমানে কোথায় আছে?
ইরানের জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ কত
সঠিক পরিমাণ নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও ইরানের সরকারি প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে জব্দ থাকা মোট সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার আল জাজিরাকে জানান, এই অর্থ ইরান বছরে হাইড্রোকার্বন (তেল-গ্যাস) বিক্রি করে যা আয় করে, তার প্রায় চারগুণ।
তিনি বলেন, ‘দশকের পর দশক নিষেধাজ্ঞায় থাকা একটি সমাজের জন্য এটি বিশাল অংকের টাকা। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অর্থ ছাড়ও দেয়, তাহলে তার ব্যবহারের ওপর কোনো শর্ত জুড়ে দেবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।’
স্নাইডার বলেন, ‘ইরানের এই সম্পদের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ জটিল ইতিহাস এবং শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিশেষজ্ঞের ঘাটতির কারণে ইরান কিছুটা সন্দিহান।’
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অর্থমন্ত্রী জ্যাকব লিউ ২০১৬ সালে বলেছিলেন, সব নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও ইরান তার সব সম্পদ ফেরত পাবে না।
সেই সময় ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল, যেখানে নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার বিনিময়ে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
লিউ কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, বাস্তবে ইরান তার জব্দ করা সম্পদের বড়জোর অর্ধেক ব্যবহারের সুযোগ পাবে। কারণ বাকি অর্থ আগেই বিভিন্ন বিনিয়োগ বা ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য বরাদ্দ হয়ে আছে।
বর্তমানে শান্তি আলোচনায় ইরান অন্তত ৬০০ কোটি ডলার ছাড় দেওয়ার দাবি জানিয়েছে, যা একটি ‘আস্থা তৈরির পদক্ষেপ’ হিসেবে কাজ করবে।
ইরানের সম্পদ কেন জব্দ করা হলো
মার্কিন নথিপত্র অনুযায়ী, প্রথম সম্পদ জব্দের ঘটনা ঘটে ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘অস্বাভাবিক ও চরম হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
তখন ইরানি ছাত্ররা তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম মিলার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তখন ইরানের নগদ সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের কম; যার মধ্যে বড় অংশটি ছিল নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের নোট।
১৯৮১ সালে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় সম্পাদিত আলজিয়ার্স চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পদের একটি বড় অংশ অবমুক্ত করে এবং বিনিময়ে ইরান তেহরানে আটকে রাখা ৫২ জন মার্কিন বন্দিকে মুক্তি দেয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের আরও অবনতি হতে থাকে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন অস্বস্তিতে পড়ে।
ইরান সবসময় দাবি করে এসেছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কেবল বেসামরিক জ্বালানি খাতের প্রয়োজনে। যদিও তারা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার অভিযোগ করেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, বিশেষ করে ইউরোপ ইরানের ওপর একাধিক দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও ইসরায়েল—যাকে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং যারা একটি গোপন কর্মসূচির মাধ্যমে এই অস্ত্র তৈরি করেছে—তাকে এমন কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়নি।
২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছায়, যা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন নামে পরিচিত। এই চুক্তির অধীনে তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কমিয়ে আনতে সম্মত হয় এবং এর ফলে তারা বিদেশে থাকা তাদের বেশিরভাগ সম্পদে পুনরায় প্রবেশাধিকার পায়।
কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে বের করে নেন। তিনি একে ‘একপেশে’ চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেন এবং ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যার ফলে দেশটির বিদেশি সম্পদ আবারও জব্দ হয়ে যায়।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি বন্দি বিনিময় চুক্তিতে সম্মত হয়, যার অধীনে তেহরান পাঁচজন মার্কিন-ইরানি নাগরিককে মুক্তি দেয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সে দেশে বন্দি থাকা বেশ কয়েকজন ইরানিকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি ইরানকে তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জব্দ তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
এই তহবিলের মধ্যে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলারের তেলের অর্থ, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে জব্দ ছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অর্থ তদারকির জন্য কাতারে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের বছরই ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে দোহায় থাকা সেই সম্পদের ওপর আবারও নিয়ন্ত্রণ হারায় ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ আংশিকভাবে জব্দ করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, পারমাণবিক চুক্তি অমান্য, সন্ত্রাসবাদ ও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে ড্রোন সরবরাহ করার অভিযোগে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কোন কোন দেশে রয়েছে এই সম্পদ
ইরানের জব্দ করা সম্পদ বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী—
চীন: ২০ বিলিয়ন ডলার
ভারত: ৭ বিলিয়ন ডলার
ইরাক: ৬ বিলিয়ন ডলার
কাতার: ৬ বিলিয়ন ডলার (যা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পাঠানো হয়েছিল)
যুক্তরাষ্ট্র: সরাসরি জব্দ করা আছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার
জাপান: ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার
ইউরোপীয় দেশ: ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার