বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) প্রথম বৈঠকে আটটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত মুলতবী করা হয়েছে। সোমবারের (৬ এপ্রিল) প্রথম সভা মুলতবী করার আগে ছয়টি প্রকল্প পাস হয়েছে এবং দুইটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার অনুষ্ঠিত এ সভার আলোচ্যসূচিতে ১৯টি প্রকল্প রাখা ছিল, যার বাকি অংশ আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে। এদিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি সভা থাকায় এদিন ১৯টি প্রকল্প উঠার কথা থাকলেও, আটটির আলোচনার মধ্যেই মুলতবি রাখা হয়। আগামী সপ্তাহে এই মুলতবী বৈঠক আবার বসবে।
এই সভায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন হবার কথা ছিল বলে জানা গেছে। বর্তমান সরকারের এই প্রথম একনেক সভায় গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নয়টি সম্পূর্ণ নতুন ও বাকি ১০টি সংশোধিত বা সময় বৃদ্ধির বা প্রকল্প পুনমুল্যায়নের প্রকল্প হিসেবে তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এই সভায় দেশের অবকাঠামো ও জনসেবামূলক খাতগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এবারের সভায় আলোচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন, ঢাকার জরুরি পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও সচিবালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ছাড়া সাভার সেনানিবাসে আধুনিক ব্যারাক নির্মাণ, দেশের আটটি বিভাগে উন্নতমানের ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন ও গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ নির্মাণ প্রকল্পগুলো অনুমোদনের জন্য তোলা হয়েছে। নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্য এবং নগরায়ণকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই প্রকল্পগুলো সাজানো হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
সোমবার আটটি প্রস্তাব আলোচনা করা হলেও কোন কোন প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে এবং কোন দুইটি বাদ পড়েছে সে ব্যাপারে কোন তথ্য গণমাধ্যমকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জানানো হয়নি।
তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী সভায় স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, প্রকল্পের সুফল যেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় এবং কোনোভাবেই যেন অর্থের অপচয় না হয়। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে আটটি প্রস্তাব আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সচিবালয়ে একনেক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের দুর্বলতা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, যা বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি এক হাজার ৩০০ এর বেশি চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প পর্যালোচনা করে সেগুলোর যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা যাচাই করবে।
অতীতে অনেক সময় রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল, কারণ নির্বাচিত সরকার সবসময় কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেনি। তবে বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে এখন জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রকল্প গ্রহণ করছে। মেট্রোরেলসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়েও বৈঠকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একটি বিস্তৃত কমিটি গঠন করে কোন প্রকল্পগুলো প্রকৃতপক্ষে জনগণের জন্য জরুরি, তা নির্ধারণ করা হবে।’
এখানে উল্লেখ্য, উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারণ, ব্যয় কাটছাঁট আর উন্নয়নের গতিপ্রকৃতির দিশা ঠিক করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই কমিটি সাধারণত রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, এনইসি সন্মেলন কক্ষে বৈঠক করে থাকে। এবার সেই রেওয়াজ পাল্টে সচিবালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর আগে রোববার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বলেছিল, সোমবার অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভার ভেন্যু পরিকল্পনা কমিশন চত্বরের এনইসি সম্মেলন কক্ষের পরিবর্তে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে (কক্ষ নং ২০০, ২য় তলা, ভবন নং-১) অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই বার্তায় এনইসি থেকে সচিবালয়ে বৈঠক সরিয়ে নেওয়ার কারণ কী তা এ বার্তায় স্পষ্ট করা হয়নি। তবে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর এখনকার কর্মস্থল সচিবালয়কে কেন্দ্র করেই সব কার্যক্রম পরিচালনার ইঙ্গিত দেন।
একনেক উপলক্ষে প্রথমবার সরকারপ্রধানের আসার কথা থাকায় পরিকল্পনা কমিশন চত্বর অনেকটাই গোছগাছের পাশাপাশি সাজসজ্জার কাজ করা হয়েছিল। কমিশনের সড়কও নতুন করে পিচ ঢেলে ঠিক করা হয়। নতুন গাছও লাগানো হয়েছিল প্রথম বৈঠককে কেন্দ্র করে। সরকার গঠনের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার তেজগাঁওয়ের কার্যালয় ছেড়ে বেশিরভাগ সময় অফিস ও নিত্যদিনের সভা সারছেন সচিবালয়ে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে একনেক গঠন করা হয়। কমিটির বিকল্প সভাপতি করা হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে।