অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গত বুধবারে (২ এপ্রিল) সংসদে পেশ করেছে। বুধবার সংসদ অধিবেশনে সংসদীয় বিশেষ কমিটির রিপোর্টে এ সুপারিশ করা হয়। রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সুপারিশের গুরুত্বপূর্ণ অন্তত নয়টি অধ্যাদেশ ও আইনের দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে দ্রুত বাস্তবায়ন ও দুইটি অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ দাবি জানান।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির যাচাই-বাছাইয়ে ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটিসহ মোট চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটিসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই আইনে পরিণত না করে পরে পুনর্বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সংশোধিত আকারে ১৫টি অধ্যাদেশ বিল হিসেবে পাসের প্রস্তাব রয়েছে।’
টিআইবি বলছে ৯৮টি ছাড়া বাকি যে অপধ্যাদেশগুলো রয়েছে তাদের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়টি অধ্যাদেশ ও আইন দ্রুত বাস্তবায়ন ও দুইটি অধ্যাদেশ বাতিল করতে পারে সরকার।
টিআইবি মনে করে, এই প্রক্রিয়ায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে এ খাতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, পুলিশ কমিশনসহ কিছু অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রস্তাব থাকলেও কী পরিবর্তন আনা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
সংস্থাটি বলছে, এসব পদক্ষেপে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন ও গুম প্রতিরোধের মতো মৌলিক বিষয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন, অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ আমলাতন্ত্র থেকে এসেছে। এতে বোঝা যায়, এখনও নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্রের প্রভাব শক্তিশালী রয়েছে।
টিআইবি তিনটি অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ ও গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫—দ্রুত প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছে।
এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫, তথ্য অধিকার (সংশোধন) আইন ২০২৫, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ পুনর্মূল্যায়ন বা সংশোধন করে দ্রুত আইনে রূপান্তরের দাবি জানানো হয়।
অন্যদিকে, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়টা দুদকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন না থাকায় নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক। এ সময় তিনি দ্রুত দুদকের নতুন অধ্যাদেশ সংশোধন ও কমিশন গঠনের আহ্বান জানান।’
টিআইবি আরও উল্লেখ করে, প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশনের প্রতিফলন নেই। বরং এর গঠন, কার্যপরিধি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবকে জোরদার করতে পারে।
সংস্থাটির মতে, এই কাঠামোর আওতায় কমিশন গঠিত হলে তা অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রভাবাধীন হয়ে পড়বে এবং একটি স্বাধীন, পেশাদার ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গঠনের লক্ষ্য ব্যাহত হবে।
জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ নিয়ে টিআইবি বলছে, এতে এমন একটি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে যে একই সঙ্গে তথ্য আন্তঃপরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক ও সেবা দাতা, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে।