বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়ে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে সরাসরি এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় ওয়াশিংটনের কাছে বিশেষ অনুমতি বা ওয়েভার চেয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।
সরকারের এই পদক্ষেপ একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তব প্রয়োজনে নেওয়া কৌশল হিসেবে দেখা হলেও অন্যদিকে তা দেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইরানের তীব্র উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচে। ফলে তুলনামূলক কম দামে রুশ তেল কেনার সুযোগ সরকার হাতছাড়া করতে চাইছে না।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয় বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে নেওয়া একটি পদক্ষেপ। ভারতের মতো দেশ একই সুবিধা নিয়ে রুশ তেল আমদানি করছে উল্লেখ করে তারা বলছেন, বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে চায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কাঠামো এই উদ্যোগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়েভার ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে বড় অঙ্কের লেনদেন করলে বাংলাদেশের ওপর সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তেল কেনাই নয়, অর্থ পরিশোধ, ব্যাংকিং চ্যানেল, জাহাজ পরিবহন এবং বিমা সুবিধাও পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণে থাকায় পুরো প্রক্রিয়াই অনিশ্চিত।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা নাকি কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার হওয়ায় এ সম্পর্কের ওপর তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের প্রবেশাধিকার নির্ভর করে। ফলে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে। সেই চুক্তির কারণে বাজার প্রতিযোগিতায় নেই এমন দেশ অর্থাৎ রাশিয়া থেকে কম দামের জ্বালানি আনতে গেলে প্রতিবন্ধকতা হয় কিনা, সেটি এখন সরকারের বিবেচ্য বিষয়।
জামায়াতে ইসলামী আমীর এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে ব্লু ইকোনমি নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে এ খাতে সম্ভাবনার খুব সামান্য অংশই কাজে লাগানো যাচ্ছে। সমুদ্রে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো উত্তোলনে বাংলাদেশ এগোতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন দেশের উপযোগী স্বাধীন মানসিকতার অভাব রয়েছে।
দেশের বড় বড় সিন্ডিকেটের পেছনে অতীতের মতো বর্তমানেও ক্ষমতাসীনদের হাত রয়েছে অভিযোগ করে জামায়াত আমির বলেন, উন্নত দেশগুলো তরল ও গ্যাসভিত্তিক জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একদিকে পরিবেশদূষণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে পরনির্ভরশীলতা কমাচ্ছে। বাংলাদেশে সে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এখানেও ঘুরেফিরে রাজনৈতিক সিন্ডিকেট রয়েছে।
সিপিবি নেতা লাকী আক্তার বলেন, এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বাড়তি নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সীমিত সময়ের জন্য রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল কিনতে ৩০ দিনের জন্য এই অনুমতি দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে এটি একটি স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাশিয়া থেকে তেল আমদানির উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এলএনজি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে গুরুত্ব না দিলে একই ধরনের সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।
রাশিয়া থেকে তেল আমদানির এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একদিকে সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে নতুন নির্ভরতার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। এখন ওয়েভার পাওয়া এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করছে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ।