শিশুদের জন্য হামের টিকা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়াকে বিগত দুই সরকারের ক্ষমাহীন অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে বহু প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে সারাদেশে হামের টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এতে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হাম প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে কাজ করা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, তাদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানান তিনি।
স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ধাপে ধাপে দেশের জিডিপির পাঁচ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এটি এককালীন নয়, পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো শহরকেন্দ্রিক, বিশেষ করে ঢাকায় সীমাবদ্ধ। এই বৈষম্য দূর করে গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) মডেলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গঠনের চিন্তাভাবনা রয়েছে।’
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই ঢাকা কেন্দ্রিক। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবুও সরকার ধাপে ধাপে এটি অর্জনের পথে রয়েছে।’
এ ছাড়া সারাদেশে এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এদের ৮০ শতাংশই নারী হবেন ও তারা জনগণের দোরগোড়ায় গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।’ মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের জন্য যানবাহন ও চালক নিয়োগের বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভবিষ্যতের স্বার্থে যেকোনো মূল্যে আমাদেরকে মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য-তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে যেকোনো নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাবে। এর পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।’
সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাতচন্দ্র বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা পর্যায়ের ছয়জন চিকিৎসক ডা. শোভন কুমার বশাখ, ডা. মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, ডা. মজিবুর রহমান, ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, ডা. সুমন কান্তি সাহা ও ডা. তাসনিম জুবায়েরকে কর্মদক্ষতার জন্য ক্রেস্ট প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।