উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান যুদ্ধের জের ধরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার জালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই গণপরিবহন ও বাজারসহ সবখাতেই মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রোববারই বেড়েছে এলপিজির দাম। পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আর সেটি হলে বর্তমান ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি’ আরও বেড়ে জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে ও তেল সরবরাহ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দাম বাড়ালেও তেলের সরবরাহ বাড়বে কিনা, তাও নিশ্চিত নয়। ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি সরকারকে আপাতত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় থেকে সামান্য স্বস্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও দেশের অর্থনীতিকে কতটা চাপের মুখে পড়তে হবে তা এখনও অজানা।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জীবনযাত্রাকে সহনীয় করতে বিকল্প উদ্যোগগুলো না নিলে মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে, যা গত মাসে ছিল নয় শতাংশের কাছাকাছি।
তিনি আরও বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধি হয়তো সরকারের নিরুপায় সিদ্ধান্ত। তবে শুল্কসহ মূল্য বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সমন্বয় করতে হবে যেন ভোক্তাকে ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি মূল্যে কিছু কিনতে না হয়।’
যদিও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তেলের দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, আবার নাও বাড়তে পারে। তার দাবি, তেলের দাম নগণ্যই বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ‘সরকার বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে কিন্তু এটা করা হয়েছে দাম সমন্বয়ের জন্য।’
তেলের দাম ও বাজার
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের সংকট তীব্র হতে শুরু করে। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ আসছে।
ঢাকাসহ সারাদেশেই পেট্রোল পাম্পগুলোতে তীব্র ভিড় দেখা যাচ্ছে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে। যদিও সরকার বরাবরই বলে আসছিল যে তেলের কোনো সংকট নেই।
এর মধ্যেই পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে উল্লেখ করে বাজারে অনেক জিনিসের দাম বেড়ে গেছে এবং গত কয়েক সপ্তাহ দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দামও বাড়তির দিকে দেখা যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে রোববার থেকেই জ্বালানি তেলের বিক্রয়মূল্য পুনঃনির্ধারণ করেছে সরকার, ফলে বেড়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অকটেনের দাম বেড়ে প্রতি লিটার ১৪০ টাকা ও পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া, নতুন মূল্য অনুযায়ী ডিজেল ১১৫ টাকা ও কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হবে।
সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির আগে ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা ও পেট্রোলের মূল্য ১১৬ টাকা ছিল।
শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর রোববার ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানো হয়েছে প্রতি কেজিতে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। এ নিয়ে এক মাসেই দ্বিতীয়বারের মতো এলপিজির দাম বাড়লো। এর আগে এপ্রিলের শুরুতে বেড়েছিল ৩২ টাকা ৩০ পয়সা।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির পক্ষ থেকে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর সুপারিশ করে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা যায় কিনা, তা দেখার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়েছিল।
সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এখন বিদ্যুতের দামও যদি বাড়ানো হয় তাহলে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।’
প্রসঙ্গত, মূল্যস্ফীতি দিয়ে কোন একটা নির্দিষ্ট সময় থেকে পরের আরেকটি সময়ে দাম কেমন বেড়েছে সেটি বোঝা যায়। অর্থাৎ আগের বছর বা মাস বা কোনো নির্দিষ্ট সময়কালের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করে খাদ্য, কাপড়, পোশাক, বাড়ি, সেবা ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদানের মূল্য বৃদ্ধির যে পার্থক্য সেটাই মূল্যস্ফীতি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সরকার এখন পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে বিকল্প উদ্যোগ কার্যকর করতে না পারলে মূল্যস্ফীতি এক বছরের মধ্যেই বা এই সময়কালে ১৩ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই মূল্যস্ফীতি ছিল নয় দশমিক ১৩ শতাংশ আর মার্চ মাসে ছিল আট দশমিক ৭১ শতাংশ।
বাজার, ক্রয়ক্ষমতা ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম এর মধ্যেই অনেকাংশে বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এমনকি দেশে উৎপাদিত ভোগ্যপণ্যসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। আবার কাঁচামালের পাশাপাশি বিদেশ থেকে পণ্য আনা ও দেশে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য পরিবহন খরচও বেড়েছে।
ঢাকার কারওয়ানবাজার থেকে গত সপ্তাহে বাজার করেছেন আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, সোনালি মুরগী কিনেছেন ৪২০ টাকা কেজি দরে, যা গত মাসেও ছিলো ৩০০টাকার মতো। এ ছাড়া কয়েক ধরনের চাল, ভোজ্য তেল ও বিভিন্ন ধরনের সবজির দামও অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘কারওয়ানবাজার ছাড়া অন্য কোথায় তরকারির দাম জিজ্ঞেস করলেই তো ১০০ টাকা বা কাছাকাছি দাম চাইছে বিক্রেতারা।’
কৃষি খাতে ডিজেলের চাহিদা মোট ডিজেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ। নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল এই সময়টাতেই ডিজেলের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় আবাদ হয় এই বোরো মৌসুমে। কৃষকরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বোরো চাষে উৎপাদন খরচ বেশ বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে।
এখন তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর স্থানীয় গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ছে, এমনকি রাইড শেয়ারের বাইকের ভাড়াও বাড়তি নেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আবার পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বাজারে নিত্য পণ্যের দাম ছাড়াও কৃষি, শিল্প উৎপাদনসহ এই তেলের মূল্য বৃদ্ধি অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলেও আশঙ্কা করছেন ভোক্তা এবং অর্থনীতিবিদেরা।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। সাম্প্রতিক মূল্যের বৃদ্ধির অজুহাত বাড়িয়ে সব কিছুর মূল্য বেড়ে যেতে পারে। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে যতটা বৃদ্ধি যৌক্তিক তার চেয়ে বেশি বাড়বে। আবার দাম বৃদ্ধির কারণে জালানি সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ নেই। সরবরাহের জন্য আমদানি করতে হবে এবং সেজন্য বাড়তি ডলার লাগবে।’
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে তাতে হয়তো সরকারের দেওয়া ভর্তুকির ওপর চাপ কিছুটা কমবে। তবে এটি দীর্ঘসময়ের জন্য হলে জিডিপি কমবে ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের আশংকা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে সরকার বাজারের ক্ষেত্রে গা ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে। যা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করতে হবে। পরিবহন, বাজার ও ভাড়ার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান জোরালো হতে হবে।’
অর্থমন্ত্রী ও বিদ্যুৎমন্ত্রী যা বলেছেন
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সচিবালয়ে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিল যে তেলের দামের প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কতটা পড়বে। জবাবে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, আবার নাও বাড়তে পারে। তেলের দাম একা মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায়না। ফুডসহ সবকিছু বিবেচনা করলে এটা খুবই সামান্য। সারা দুনিয়াতে তেলের দাম বেড়েছে। আমরা জনগণের কথা মাথায় রেখে এতদিন বাড়াইনি। কিন্তু আমাদের তহবিলের ওপর এত প্রেশার আসছে সেজন্য এটুকু বাড়াতে হয়েছে।’
অন্যদিকে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন আমদানি করা তেলের দাম যা পড়েছে তার চেয়েও কম রেখে তারা দামের সমন্বয় করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এটা করতে বাধ্য হয়েছি আমরা, কারণ এটা বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনতে হয় ও সেটা যাতে কিছু বেড়ে আমরা যেন সহনীয় লেভেলে (পর্যায়ে) থাকতে পারি, সেই ব্যবস্থা করেছি।’