দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, জনগণ তাদের হারানো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার ফেরত পেয়েছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) সকাল ১১টায় বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ই-বেইলবন্ড সিস্টেমের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে বগুড়াসহ সাত জেলায় ই-বেইলবন্ড সিস্টেম চালু হলো। এ সময় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেছেন, আর কখনো যাতে কোনো স্বৈরাচার কিংবা তাবেদার জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। সে লক্ষেই বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় করে দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের সুফল মিলবে না। সামাজিক ভারসাম্য, সমতা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম উপাদান। যা মূলত নৈতিকতা, আইন ও মানুষের প্রাপ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক দিক।
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলেন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকদের ভূমিকাই মুখ্য। এ কারণে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে হরণ করা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিচারবিভাগকে দলীয় আদালতে পরিণত করা হয়েছিল।
আইনের দোহাই দিয়ে শাসন চালালেও তখন দেশে ‘ন্যায়বিচার’ ছিল না দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ অন্ধকারের শাসন থেকে মুক্তি পায়। সুতরাং বর্তমান সরকার এবার দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।
তিনি আরও বলেন, আদালত হয়রানির জায়গা নয় বরং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিরাপদ স্থল—জনমনে এমন বিশ্বাস দৃঢ় হলে সমাজ থেকে ‘মব ভায়োলেন্স’ও দূর হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। এ জন্য বর্তমান সরকার ‘ন্যায় ও আস্থার’ জায়গা হিসেবে বিচার বিভাগকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় জনগণের হয়রানি লাঘব করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বিচার, প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে। দেশের সব আদালতে ই-বেইলবন্ড পদ্ধতি চালু করা গেলে জনগণের বিচারপ্রাপ্তিতে বিলম্ব ও বৈষম্য দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার, বিষয় দুটি একটি আরেকটির পরিপূরক। আমার কাছে মনে হয় রাষ্ট্রে আইনের শাসনই শেষ কথা নয় বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র এবং সমাজে আইনানুগ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক। আমি মনে করি, জামিন প্রক্রিয়ায় ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থা বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যাত্রা পথে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ।’
‘ইলেক্ট্রনিক জামিননামা’ বা ই-বেইলবন্ড পদ্ধতির মাধ্যমে অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই জামিননামা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাওয়ার ফলে বিচার প্রার্থীদের হয়রানি লাঘব হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগে একটি জামিননামা সম্পন্ন করতে আদালত থেকে জেলখানায় পৌঁছানো পর্যন্ত আইনজীবী, মুহুরি, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, পিয়নসহ নানা পরিক্রমায় কমপক্ষে ১৩টি ধাপ পার হতে হতো। ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি চালুর পর এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে জামিননামা কিছু সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে। এ কারণে বর্তমান সরকার সারাদেশের সব আদালতকে ই-বেইলবন্ড পদ্ধতির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এরই অংশ হিসেবে আজ থেকে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া—এ কয়টি জেলায় আদালতের কার্যক্রমে ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি চালু হলো। এর ফলে জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির কারামুক্তির ক্ষেত্রে হয়রানি লাঘব হবে। অন্যদিকে বিরোধীপক্ষ কিংবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের তৎপরতা কিংবা জামিননামা জালিয়াতির ঘটনার সুযোগও কমে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন বিচারক যেহেতু জামিন আদেশটি যাচাই করে সরাসরি অনলাইনেই কারা প্রশাসনের কাছে পাঠাবেন সেহেতু কারা প্রশাসন জামিন আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারা মুক্তি দিতে সক্ষম হবেন। ফলে ই-বেইলবন্ড বা ইলেক্ট্রনিক জামিননামা ব্যবস্থা বিচার ব্যবস্থায় জনগণের অহেতুক হয়রানি এবং দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে।
তারেক রহমান বলেন, ই-বেইলবন্ড সিস্টেমকে পুলিশের সিডিএমএস, আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড ভেরিফিকেশনের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
জনদুর্ভোগ কমাতে বিচার ব্যবস্থার পুরো প্রক্রিয়াকেই বর্তমান সরকার কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের আওতায় এনে এর আধুনিকীকরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিচার ব্যবস্থায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট, রিলিজ অর্ডার এবং থানা থেকে ওয়ারেন্ট রিকলের কাজ সম্পন্ন করবে। এটি করা সম্ভব হলে এক জেলার অভিযুক্ত আসামি অন্য জেলায় গ্রেপ্তার হলে অনলাইনে দ্রুত ‘উপনথি’ প্রেরণের মাধ্যমে জামিন শুনানি সহজ করা হবে। ফলে পুলিশি হয়রানি ও ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বন্দি করে রাখার যে অপসংস্কৃতি, তা উৎপাটন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু প্রযুক্তির উন্নয়নই নয়, আমরা মানসিকতারও উন্নয়ন চাই। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেই বিচার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী, পুলিশ কিংবা কর্মকর্তা ও একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকবে না। বিচার বিভাগ থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অনবদ্য পাদপীঠ। আমি বিশ্বাস করি, এক্সেস টু জাস্টিস ফর অল।’ ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার-উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘আজকের এই ডিজিটাল উদ্যোগ সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে একটি বিশাল মাইলফলক। আমি আইন মন্ত্রণালয়, কারা কর্তৃপক্ষ এবং এই সিস্টেমের নেপথ্যে কাজ করা সকল আইটি বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ করে আইনজীবী ও বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনারা এই প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।’
এদিকে জেলখানায় কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মানুষ অকারণে কিংবা টাকার অভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারায় বছরের পর বছর বিনাবিচারে জেলে থাকতে বাধ্য হচ্ছে জানিয়ে এ ব্যাপারে কী করা যায় সেটি খতিয়ে দেখতে আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।