বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আড়াই মাসের মাথায় সরকারের সাফল্য নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলুর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এ বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি সরকার প্রথম আড়াই মাসেই যে উন্নয়নের ‘মহাউৎসব’ শুরু করেছে, তা গত ১৭ বছরের উন্নয়ন কাঠামোর চেয়েও বেশি ফলপ্রসূ হবে।
তবে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা মনে করছেন, একটি নতুন সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য এখনই যথেষ্ট সময় হয়নি। তারা বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের ‘অপশাসন’ ও গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে সরকারকে পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে আরও সময় প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন ধরনের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন, যা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ওপর বাড়তি চাপ ও প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
মন্ত্রী-এমপিদের ওপর কড়া নজরদারিঃ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও প্রভাবশালী এমপিদের কার্যক্রম নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশনার পাশাপাশি দায়িত্বের বাইরে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য না করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে বাড়ানো হয়েছে মনিটরিং।
দলীয় সূত্র জানায়, সরকারের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে তদবির-বাণিজ্য। এ কারণে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নেতা-কর্মী কিংবা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অনৈতিক সুপারিশে সাড়া না দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকেও দলের অঙ্গসংগঠনগুলোকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে- রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ যেন তদবির না করেন। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক পদ বঞ্চনার মতো সিদ্ধান্তও আসতে পারে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, সরকার তদবির, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অবস্থান নিয়েছে। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কয়েকটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে কয়েকজন মন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্যের কারণে সরকারকে মাঝেমধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতেও পড়তে হচ্ছে।
বিএনপির একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত সচিবালয়ে উপস্থিত থেকে অফিস কার্যক্রম তদারকি করছেন। তার এই কর্মপদ্ধতির প্রভাব অন্য মন্ত্রীদের মধ্যেও পড়েছে। তারা নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসছেন। এছাড়া প্রশাসনিক কাজের সীমা ও প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ টিম বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানা গেছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সচিবালয় ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের ভিড় বেড়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, ঠিকাদারি, সারের ডিলার নিয়োগ, বদলি-পদোন্নতি, চাকরির ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নানা ধরনের আবদার নিয়ে মন্ত্রীদের দপ্তরে হাজির হচ্ছেন অনেকে। এতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা অনেকটা বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়ছেন বলেও স্বীকার করেছেন কেউ কেউ। তবে তারা বলছেন, আইনসঙ্গত ও যৌক্তিক দাবি হলে তা বিবেচনা করা হবে।
একাধিক প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার কথা উল্লেখ করে অনেকে বিশেষ সুবিধা চাইছেন। কিন্তু সরকারপ্রধানের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা প্রকাশ্যে কাউকে নিরুৎসাহিত না করলেও অনৈতিক সুবিধা না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছেন।
সরকার গঠনের পরপরই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের গণমাধ্যমে সতর্কভাবে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের পরিকল্পনা বিক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ না করতেও বলা হয়েছিল। কিন্তু গত তিন মাসে কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এসব বক্তব্য নিয়ে কড়া সমালোচনা করছে। ফলে এখন মন্ত্রীদের ‘কম কথা, বেশি কাজ’ নীতিতে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় রদবদলের আভাসঃ দলীয় সূত্রের দাবি, আগামী ১৮০ দিনের কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিশেষ একটি টিম মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করছে। তবে কয়েকজন সংসদ সদস্যের মতে, এই সময়সীমা ছয় মাসের পরিবর্তে তিন মাসেও নেমে আসতে পারে। ঈদুল আজহার পর কিংবা আগামী বাজেটের পর মন্ত্রিসভায় রদবদলের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংসদ সদস্য বলেন, মন্ত্রিসভার আকার বাড়তে পারে এবং সেখানে নতুন টেকনোক্র্যাট মুখ যুক্ত হতে পারেন। আবার অতিরিক্ত সমালোচিত দুই-একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে বাদ দেওয়া হতে পারে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সদস্যকেও মন্ত্রিসভায় আনা হতে পারে। এছাড়া সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান ও বরকত উল্লাহ বুলুর নাম। টেকনোক্র্যাট কোটায় সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও হাবিবুন্নবী খান সোহেলের নামও শোনা যাচ্ছে। এছাড়া ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সংসদ উপনেতা করার সম্ভাবনার কথাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিমন্ত্রী, যিনি অতীতে ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। প্রথমবার দায়িত্ব পাওয়ায় তিনি মন্ত্রণালয়ের কাজের ধরণ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে ভবিষ্যতেও জনগণের কাছে জবাবদিহিতার বিষয়টি মাথায় রেখে ন্যায়সংগতভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহামেদ বলেন, কেন্দ্র থেকে অঙ্গসংগঠনের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে- সরকারের কোনো সদস্যের কাছে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয়ে তদবির করা যাবে না। কেউ এ ধরনের চেষ্টা করলে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে দলীয় পদ বা দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েলও একই ধরনের নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার গঠনের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, কোনো অনৈতিক কাজ বা তদবিরের সঙ্গে কেউ জড়িত হতে পারবেন না। সরকারের ভেতরে এই বার্তার প্রভাব পড়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের কারণে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এখন অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এ বিষয়ে সতর্ক মন্তব্য করে বলেন, মন্ত্রিসভায় কে আসবেন বা কে বাদ পড়বেন- এ সিদ্ধান্ত একান্তই প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এখতিয়ার।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, মন্ত্রিসভায় কে যোগ দেবেন এবং কীভাবে পরিবর্তন হবে, তা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তবে যারা সুযোগ পাবেন, তারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলেই বিএনপির নেতাকর্মীদের বিশ্বাস।