মোটরসাইকেল মালিকদের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এআইটি বা অগ্রিম আয়কর আদায়ের পরিকল্পনা করছে। তবে কৌতূহল তৈরি হয়েছে কিভাবে এই কর আদায় হবে তা নিয়ে।
এ কৌতূহলের মূল কারণ হলো একদিকে করযোগ্য আয় নেই এমন অনেকের কাছে মোটরসাইকেল বা বাইক আছে। আবার অন্যদিকে এসব বাইক মালিকদের অনেকের করযোগ্য আয় না থাকায় ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিন) নেই। ফলে কীভাবে মোটরসাইকেলের মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হবে তা এখনো আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের দিক থেকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোটরসাইকেলসহ কর নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা যানবাহনের জন্য অগ্রিম আয়কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, এখন মোটরসাইকেল মালিকদের প্রতি বছর ট্যাক্স টোকেন ফি দিতে হয়। ট্যাক্স টোকেনের বার্ষিক মেয়াদ শেষে এটি নবায়ন করতে হয়। এখন ট্যাক্স টোকেনের পাশাপাশি সারাদেশের সব মোটরসাইকেলের জন্য অগ্রিম আয়কর আরোপের চিন্তাকে ইতিবাচক বলছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান।
বদিউর রহমান বলেন, ‘চিন্তাটা ভালো ও যৌক্তিক। তবে যৌক্তিক হারে করটা নির্ধারণ হতে হবে। টিন নাম্বারের মাধ্যমে নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে এই কর আদায় করা হবে সেটি এনবিআরকেই ঠিক করতে হবে।’
যদিও মোটরসাইকেল থেকে অগ্রিম কর আদায়ের সরকারি চিন্তার খবর গণমাধ্যমে আসার পর মালিক ও চালকদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তাদের একটি দল ইতোমধ্যেই এনবিআর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে করারোপ না করার দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে।
যেভাবে আদায়ের চিন্তা হচ্ছে
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৯ লাখের মতো নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে।
বাজেট প্রণয়ন প্রস্তুতির সাথে সংশ্লিষ্ট এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখন পর্যন্ত টিন নাম্বারের বিপরীতেই এআইটি আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে আলোচনা পর্যালোচনা চলছে। তবে টিন নাম্বার নেওয়াটাই ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ এতে করে ধীরে ধীরে করের আওতায় থাকা ব্যক্তিরা একটি ট্যাক্স সিস্টেমের মধ্যে আসবেন।
অন্যদিকে বদিউর রহমান বলেন, ‘আয়ের দিক থেকে করের ন্যূনতম স্লাব বা ধাপে না থাকলেও মানুষ যাতে করখাতে অবদান রাখার সুযোগ পায় সেজন্যই বাইক মালিকদেরও করের আওতায় থাকা দরকার। মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের তো নিয়ম আছে। সে অনুযায়ী এনবিআর প্রসেস করবে কিভাবে কর আদায় করা যায়। এটা এমনি কর হোক, আর এআইটি হোক, সেটা রিজনাবল হতে হবে। এভাবে সবাইকেই করখাতে কন্ট্রিবিউট করার সুযোগ দিতে হবে। সরকারের আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সেটি ভূমিকা রাখবে।’
উল্লেখ্য, টিআইএন বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার হলো একটি বিশেষ নম্বর, যা দিয়ে একজন করদাতাকে শনাক্ত করা হয়। বাংলাদেশে ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে অনেক কাজেই টিন থাকা বাধ্যতামূলক। তবে বাইকের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর আদায়ের জন্য ভিন্ন চিন্তাও রয়েছে। অর্থাৎ টিন নাম্বার ছাড়াই এখন যেভাবে বার্ষিক ট্যাক্স টোকেন ফি আদায় করা হয় তার সাথেই এআইটি আদায় করা যায় কিনা।
সেটি হলে বাইক চালকদের মধ্যে যাদের ন্যূনতম করযোগ্য আয় নেই তাদের রাজস্ব বোর্ড থেকে টিন নাম্বার নিতে হবে ও এর ফলে বিপুল সংখ্যক বাইক মালিক কোনো ঝামেলা ছাড়াই এআইটি দিতে পারবেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
কর হার কেমন হতে পারে
এনবিআর কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে যে এবার বাজেটে নতুন প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী। জুন মাসেই তিনি জাতীয় সংসদে এ বাজেট উপস্থাপন করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল নতুন এই অগ্রিম আয়করের আওতাভুক্ত রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
এরপর অর্থাৎ ১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের জন্য বার্ষিক কর সর্বনিম্ন দুই হাজার টাকা হতে পারে। এরপরের ধাপে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত বাইকের জন্য পাঁচ হাজার টাকা ও এর চেয়ে বেশি সিসির বাইকের জন্য বছরে দশ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এ ধরনের আলোচনার খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি দেশে অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা কত তা জানা না থাকলেও এ ধরনের যানবাহনের জন্যও কর নির্ধারণের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে মোটরসাইকেলের ওপর সম্ভাব্য নতুন কর আরোপের পরিকল্পনার প্রতিবাদে বাইক মালিক ও চালকরা রোববার আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। তারা এনবিআর চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে দেওয়া স্মারকলিপিতে বলেছেন, অগ্রিম আয়করের প্রস্তাব দেশের লাখ লাখ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিক্ষোভে যারা অংশ নিয়েছেন তারা তাদের বক্তৃতায় বলেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের দাম এমনিতেই অনেক বেশি। এ ছাড়া এখন রাইড শেয়ারিং বা পণ্য ডেলিভারি দিয়ে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত অতিরিক্ত কর সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে সংকটে ফেলবে।’
ঢাকার গুলশানের ১১৩ নম্বর সড়কে সোমবার কয়েকজন বাইক চালক এ নিয়ে কথা বলেছেন। শাহাবুদ্দিন নামের একজন বলেন, ‘আমি ট্যাক্স টোকেন ফি দেই। নতুন করে ট্যাক্স দিলে সেটা অন্যায় হবে।’
এ সময় রফিক উল্ল্যাহ নামে আরেকজন বলেন, ‘যারা শখ করে চালায় তাদের জন্য বাড়তি ট্যাক্স ঠিক হতে পারে কিন্তু আমাদের জন্য এটাই আয়ের উৎস। এখানে বাড়তি ট্যাক্স কেন দিবে।’