“আজিকে কোরবানির ঈদ,
ত্যাগের তরে খুলে দে হৃদয়-দ্বার—
ভুলে যা সব স্বার্থের হিসাব,
মানুষ হ’ ত্যাগে আবার।”
কবির কথার সুর ধরে বলা যায়, ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের যে মহিমান্বিত শিক্ষা ইসলাম মানবজাতিকে দিয়েছে, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক পবিত্র ঈদ উল আযহা। মুসলমানের জীবনে যেমন আছে দুঃখ, সংগ্রাম, ত্যাগ ও ধৈর্য, তেমনি আছে আনন্দ ও উৎসবও। তবে ইসলামের উৎসব নিছক আমোদ-উল্লাসের নয়; এর ভেতরে থাকে বিপুল শিক্ষা, আত্মার পবিত্রতা, মানবতার আহ্বান এবং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রেরণা। সেই কারণেই ঈদ উল আযহা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি এক গভীর আত্মিক উপলব্ধির নাম।
আরবি আযহা শব্দের অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ। তাই ঈদ উল আযহাকে বলা হয় ত্যাগের উৎসব। আমাদের দেশে এটি কোরবানির ঈদ নামেই বেশি পরিচিত। কিন্তু কোরবানি মানে কেবল পশু জবাই নয়; কোরবানি মানে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নিজের প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকা। এই ঈদের মূল শিক্ষা নিহিত আছে মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হজরত ইবরাহিম (আ.) এবং তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের ঘটনার ভেতরে।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে, মহান আল্লাহ হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে স্বপ্নে নির্দেশ দিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করতে। একজন পিতার কাছে সন্তানের চেয়ে প্রিয় আর কেইবা হতে পারে! কিন্তু আল্লাহর নির্দেশের সামনে তিনি এতটুকুও দ্বিধা করেননি। পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে বললেন, ‘হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখছি, আমি তোমাকে কোরবানি করছি। এখন তোমার মত কী?’ জবাবে পুত্র বললেন, ‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের কাতারেই পাবেন।’
মানব ইতিহাসে পিতা-পুত্রের এমন আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য আর নেই। যখন হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে উদ্যত হলেন, তখন মহান আল্লাহ তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি মহান জন্তু কোরবানির ব্যবস্থা করে দিলেন। কোরআনের ভাষায়, ‘এটি ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা।’ এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আল্লাহ মানবজাতিকে শিখিয়ে দিলেন তিনি মানুষের রক্ত চান না, তিনি চান মানুষের তাকওয়া, আন্তরিকতা ও আনুগত্য।
পবিত্র ঈদ উল আযহার সঙ্গে হজের সম্পর্কও গভীরভাবে জড়িত। জিলহজ মাসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান পবিত্র কাবাঘরে সমবেত হন। একই পোশাকে, একই কণ্ঠে, একই আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তারা ঘোষণা করেন মানবতার ঐক্য ও সাম্যের বাণী। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত আরাফাত, মিনা ও জমজম আজও মুসলিম উম্মাহর আত্মিক কেন্দ্র হয়ে আছে।
কোরবানির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি। পশু জবাই এখানে একটি প্রতীক মাত্র। প্রকৃত কোরবানি হলো মানুষের অন্তরের পশুত্বকে জবাই করা, অহংকার, হিংসা, লোভ, স্বার্থপরতা ও অন্যায়ের প্রবৃত্তিকে দমন করা। ইসলাম মানুষকে শেখায়, যে হৃদয়ে মানবিকতা নেই, যে জীবনে ত্যাগ নেই, সে কোরবানির প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারে না।
আজকের পৃথিবীতে ঈদুল আযহার শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজন। ভোগবাদ আর আত্মকেন্দ্রিকতার এই সময়ে মানুষ ধীরে ধীরে সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলছে। অথচ কোরবানি আমাদের শেখায় ভাগাভাগি করে নেওয়ার সৌন্দর্য। কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের বন্ধন। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই, এখানে আনন্দ একার নয়, সবার।
দুঃখজনকভাবে অনেক সময় কোরবানির আসল শিক্ষা আড়াল হয়ে যায় বাহ্যিক আয়োজনের আড়ম্বরে। কোথাও এটি হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতা, কোথাও লোকদেখানো আয়োজন। অথচ ইসলাম কখনো বাহ্যিক চাকচিক্যকে গুরুত্ব দেয়নি। ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে নিয়তকে, তাকওয়াকে, বিনয়কে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কোরবানির গোশত বা রক্ত; পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।’
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে উম্মতকে বহুবার সতর্ক ও উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, কোরবানির দিনে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোরবানি। তবে সেই কোরবানি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, অহংকার বা লোক দেখানোর জন্য নয়।
পবিত্র ঈদ উল আযহা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্যিকার মুমিন সে-ই, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে। কোরবানির প্রকৃত মহিমা পশু জবাইয়ে নয়; বরং আত্মাকে পবিত্র করার মধ্যে। মানুষ তখনই ঈদ উল আযহার শিক্ষা ধারণ করতে পারে, যখন সে নিজের ভেতরের হিংসা, লোভ, অন্যায় ও স্বার্থপরতাকে কোরবানি দিতে শেখে।
ত্যাগের এই মহিমাই ঈদুল আযহার প্রকৃত সৌন্দর্য। যে হৃদয়ে কোরবানির শিক্ষা জাগ্রত হয়, সে হৃদয় মানবতার জন্য উন্মুক্ত হয়। তাই আসুন, এবারের ঈদুল আযহায় আমরা শুধু পশু কোরবানি না করে নিজেদের ভেতরের পশুত্বকেও কোরবানি করি। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং আত্মত্যাগের মহান আদর্শেই উদ্ভাসিত হোক আমাদের ঈদ।
ত্যাগেই মানুষের মহত্ত্ব,
ত্যাগেই হৃদয়ের জয়—
যে নিজেকে বিলাতে পারে,
ঈদ তার জীবনময়।