আগামী ১১ জুন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে, যার সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বাজেটে তারা কী পাচ্ছেন?
এদিকে বাজেটের রাজস্ব জোগান দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আসছে বাজেটে দাম বাড়বে যেসব পণ্যের তার মধ্যে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে— ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ ও মসলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। কারণ, সরকার স্থানীয় সরবরাহ ও আমদানির ওপর উৎসে কর দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে। এছাড়া কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ, সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য, বিদেশি প্রসাধন সামগ্রী এবং খুচরা পর্যায়ের বিভিন্ন প্যাকেটজাত পণ্যের দাম বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের- এনবিআর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং আইএমএফ-এর শর্তের কারণে এবারের বাজেটে বেশ কিছু পণ্যে কর ও শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ক্রেতাদের পকেটে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নিত্যপণ্যের উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার তা আবারও বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা চলছে। ফলে যেসব খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে: ধান ও চাল, গম ও আটা-ময়দা, আলু, পেঁয়াজ ও রসুন, ডাল ও মসলা জাতীয় পণ্য, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল এবং চিনি, লবণ এবং বিভিন্ন ফলমূল।
নতুন বাজেটে রাজস্বের আওতা বাড়াতে খুচরা দোকানদার বা রিটেইলারদের ওপর নতুন করে দশমিক দুই শূন্য উৎসে কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। ডিলাররা যখন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করবেন, তখন এই কর কাটা হবে। ফলে সাবান, শ্যাম্পু, বিস্কুটসহ মুদি দোকানের প্রায় সব ধরনের প্যাকেজিং পণ্যের দাম গ্রাহক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও রাজস্ব বাড়াতে এবার কম্পিউটার এবং কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ (পিসি পার্টস) আমদানির ওপর শুল্ক বা কর বৃদ্ধির আলোচনা রয়েছে। এর ফলে ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষার্থী ও আইটি খাতের পেশাজীবীদের জন্য প্রযুক্তি পণ্যের খরচ বেড়ে যেতে পারে।
প্রতি বছরের মতো এবারও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বলে সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সকল প্রকার তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবনা রয়েছে। তামাকবিরোধীদের দাবির মুখে এই খাতে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো প্রায় নিশ্চিত।
আমদানি করা প্রসাধন সামগ্রীর ওপর শুল্ক বাড়তে পারে। বিশেষ করে লিপস্টিক, লিপ লাইনার, লিপ গ্লস ইত্যাদির ওপর ন্যূনতম ট্যারিফ রেট বাড়ানোর প্রস্তাবনা রয়েছে। এছাড়া কিছু বিলাসবহুল সামগ্রীর আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক বাড়ানোর ফলে সেগুলোর দাম বৃদ্ধি পাবে।
নিত্যপণ্যের ওপর কর কমানো সত্ত্বেও বাজারে দাম না কমায়, সরকার মনে করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা নিচ্ছে। তাই সরকার এবার উৎসে কর আবার আগের জায়গায় ১ শতাংশ ফিরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছে। রাজস্ব আদায়ের চাপ: আগামী বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অর্থের জোগান দিতে এনবিআর-কে করের আওতা বাড়াতে হচ্ছে। ডলার সংকট ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ডলারের উচ্চ মূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন খরচে।
অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডি’র মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে গত ৫০ মাসেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও প্রায় ৮ শতাংশের ওপরে। কর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর দ্বিগুণ করা হলে এবং খুচরা পর্যায়ে নতুন কর বসানো হলে তার পুরো বোঝাই শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের বহন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের উচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর ভর্তুকি বৃদ্ধি করা এবং করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া।
বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট জনবান্ধব হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। শুক্রবার রাজবাড়ী পৌরসভায় এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া শুরু হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা জানান, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় রকমের পরিবর্তন করতে চান। কর্মসংস্থান নিশ্চিত, শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে সরকার।