প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট অনুমোদনের লক্ষ্যে মন্ত্রিসভার বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত এ সভায় জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে জাতীয় বাজেট অনুমোদন করা হয়।
রীতি অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে মন্ত্রিপরিষদের এ বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভাতেই জাতীয় বাজেটের অনুমোদন দেওয়া হয়। বিশেষ সভা শেষে বিকেল ৩টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেবেন। পরে অর্থমন্ত্রী ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট ও ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন।
দুপুর ১টার দিকে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বাজেট প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। অর্থ বিলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষরের পর বিকেল ৩টায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করবেন।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংসদ না থাকায় উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে সরকারের ব্যয় ও সংশোধিত অর্থ অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হয়েছিল। পরে রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর নির্দিষ্টকরণ অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় এবং জারির করার পর তা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত বাংলাদেশের ভিন্ন বাস্তবতায় তখন সংসদের বাইরে ভিন্ন আঙ্গিকে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছিল। গত ২ জুন অর্ন্তবর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। সংসদ না থাকায় তার বাজেট বক্তৃতা বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে সম্প্রচার করা হয়।
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করবেন। প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র পথে এগিয়ে নেওয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে।
এ ছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে ও সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে। বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামের একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত ও করসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও নীতিনির্ধারকেরা আশা করছেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রম অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।