সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর খুব কাছাকাছি। সর্বশেষ ২২ জুন রাতে অনুভূত ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এবং গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীতে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পও আলোচনায় আসে। এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকার আশপাশে একের পর এক ভূমিকম্প কি বড় কোনো বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুনের ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪.৪। অন্যদিকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এর মাত্রা ছিল ৪ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, নরসিংদী ও রূপগঞ্জের অবস্থান কাছাকাছি হওয়ায় তথ্যের এই পার্থক্য খুব বেশি তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
গত দেড় বছরে ঢাকার আশপাশে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ছিল মাত্র ১৩ কিলোমিটার। ওই ভূমিকম্পে প্রাণহানি ঘটে এবং শত শত মানুষ আহত হন। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই কম্পনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশে আরও কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। পরে নরসিংদীর পলাশ, ঘোড়াশাল ও শিবপুর এলাকাতেও একাধিক ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক এসব কম্পনের পেছনে টেকটোনিক কার্যকলাপ বা সক্রিয় ফল্ট লাইনের প্রভাব থাকতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, অনেক সময় দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো ফল্টও আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বুয়েটের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদী আহমেদ আনসারী গণমাধ্যমটিকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার কাছাকাছি যে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। তবে এসব কম্পন ভূমিকম্প ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীরের মতে, বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ—এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের প্রভাব রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। তবে মেহেদী আনসারীর মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অতীতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করা ফল্টগুলো। ইতিহাসে শ্রীমঙ্গল, ডাউকি ও মধুপুর ফল্ট এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এসব অঞ্চল বড় ঝুঁকির উৎস হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জন্য ঝুঁকি নির্ভর করে শুধু ভূমিকম্পের উৎসের ওপর নয়, নগরীর অবকাঠামোগত সক্ষমতার ওপরও। মধুপুরের শক্ত লাল মাটির ওপর গড়ে ওঠা কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও দুর্বল নির্মাণশৈলী বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভবনের মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
গবেষকদের আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’। এগুলো এমন ফল্ট, যা ভূ-পৃষ্ঠে দৃশ্যমান নয় এবং শনাক্ত করাও কঠিন। বাংলাদেশে অন্তত দুটি ব্লাইন্ড ফল্ট চিহ্নিত হয়েছে—ময়মনসিংহ ও রংপুরে। এ ধরনের ফল্টে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আগে থেকে নির্ণয় করা তুলনামূলক কঠিন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।