সরকারি চাকরিতে ‘কোটা সংস্কার’-এর দাবিকে ঘিরে ২০২৪ সালে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, দুই মাস পর সেটি নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করে; ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের পতন হয় এবং রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়।
তবে চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল এর আগেও। ২০১৮ সালে আন্দোলনের মুখে সরকার একেবারেই বাতিল করে দিয়েছিল কোটা পদ্ধতি। এ সংক্রান্ত পরিপত্রও জারি করে তৎকালীন সরকার। সরকারের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে করা একটি রিটের পর, ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ে আবারও চাকরিতে ফিরে আসে কোটা পদ্ধতি।
সেসময় কোটা পুনর্বহাল নয়, বরং যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত চেয়ে ২০২৪ সালের ৯ জুন আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
কিন্তু আন্দোলন বেগবান করতে থাকে শিক্ষার্থীরা। যেটি জুলাই মাসে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। যার জেরে অনেক জায়গায় পুলিশ ও তৎকালিন সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের সাথে সংঘাত হয় আন্দোলনকারীদের। এরইমধ্যে এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে ঘিরে তীব্র ক্ষোভ দেখা যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
এরপরই সারাদেশে সহিংসতা, প্রাণহানি, সড়ক অবরোধ, ইন্টারনেট শাটডাউন, পুলিশের ওপর হামলা, সেনা মোতায়েন, কারফিউ জারির মতো ঘটনা ঘটে। কারফিউর মধ্যেই ২১ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিলের শুনানির জন্য বসে সর্বোচ্চ আদালত, যেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করে দেয় সর্বোচ্চ আদালত।
কিন্তু ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদের জন্য নানা ধরনের সুবিধা ঘোষণা করলে মূলত কোটা নিয়ে নানা শঙ্কা তৈরি হয়। যেমন, আধা-সরকারি চাকরিতে জুলাইয়ে আহত ও নিহতদের পরিবারের সক্ষম সদস্যদের অগ্রাধিকারের মতো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয় এক প্রজ্ঞাপনে ।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জুলাইয়ের আন্দোলনকারীরাও কি চাকরিতে কোটা সুবিধা পাচ্ছেন? এখন তাহলে সরকারি চাকরিতে কত শতাংশ কোটা আছে? বা চাকরিতে নতুন কোনো কোটা যুক্ত হয়েছে কি না?
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে কোন কোটা কত শতাংশ
শেখ হাসিনার সরকার ২০১৮ সালে কোটা বিলুপ্ত করার আগে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য পাঁচ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এক শতাংশ, এই পাঁচ ক্যাটাগরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল।
২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ে আগের ওই ব্যবস্থা ফিরে এলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে, যা একপর্যায়ে শেখ হাসিনার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। এমন প্রেক্ষাপটে আপিল বিভাগ ওই বছরের ২১ জুলাই ৫৬ শতাংশ কোটা বাতিল করে রায় দেয়।
সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে রায় দেয় আপিল বিভাগ। আর ৫৬ শতাংশের পরিবর্তে সাত শতাংশ কোটায় নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য পাঁচ শতাংশ কোটা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় আপিল বিভাগের রায়ে। আগে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা কোটার যে সুবিধা পেতো সেটি বাতিল করে দেওয়া হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এক শতাংশ কোটা আর প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য এক শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেয় সর্বোচ্চ আদালত।
তবে, নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধা তালিকা থেকে পূরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয় রায়ে। একইসঙ্গে, প্রয়োজন ও সার্বিক বিবেচনায় সরকার আদালতের নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
পরে ২৩ জুলাই গেজেটও জারি করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। যদিও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয় তাকে।
বর্তমান বিএনপি সরকারের জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারি এ বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে হয়। বাকি সাত শতাংশ কোটায় মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলামের উত্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সংসদে তিনি এই তথ্য দেন।
পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রী আরও জানান, ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই প্রকাশিত একটি সরকারি গেজেট অনুযায়ী এখন সরকারি চাকরিতে কোটা বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ, ২০২৪-এর আন্দোলনের মুখে হাসিনা সরকারের সময়ে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় অনুযায়ীই এখনো সরকারি চাকরিতে সাত শতাংশ কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম মতিউর রহমান জানান, ‘২৩ জুলাইয়ের গেজেট অনুযায়ী, সব গ্রেডের সরকারি চাকরিতে সাত শতাংশ কোটায় ও ৯৩ শতাংশ মেধায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বাইরে অন্য কোনো কোটা নেই।’
কখন থেকে বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা
কোটা বলতে বোঝায় চাকরি বা পড়াশোনার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের কিছু সুবিধা সংরক্ষিত রাখা। মূলত সমাজের পিছিয়ে পড়া বা অনগ্রসর মানুষদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে বা কোনো বিশেষ কারণে কোনো শ্রেণিকে বিশেষ সুবিধা দিতে কোটার ব্যবস্থা থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই কোটা পদ্ধতি চালু আছে। ব্রিটিশ শাসনামলে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতীয়দের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু ছিল। পরে পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যও কোটা বরাদ্দ করা হয়। দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলেও প্রদেশভিত্তিক কোটা বরাদ্দ ছিল।
বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকেই চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা, জেলা ও নারী কোটা ছিল। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কর্পোরেশন ও দপ্তরে নিয়োগ ও কোটা বণ্টনের বিষয়ে ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সরকার একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে।
এতে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ মেধা ও বাকি ৮০ শতাংশ জেলা কোটা রাখা হয়। এই ৮০ শতাংশ জেলা কোটার মধ্য থেকেই ৩০ শতাংশ কোটা মুক্তিযোদ্ধা ও ১০ শতাংশ কোটা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ কোটার বড় একটি অংশই বরাদ্দ করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।
এর চার বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মতো কোটা বণ্টনে পরিবর্তন আনা হয়। এ সময় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো হয় এবং শুধু নারীদের জন্য আলাদা করে কোটার ব্যবস্থা করা হয়। মোট কোটার ৪০ শতাংশ মেধা, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও বাকি ১০ শতাংশ কেবলই জেলার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের কোটায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে ১৯৮৫ সালে কোটা পদ্ধতির সংশোধন আনে তৎকালীন সংস্থাপন (বর্তমান জনপ্রশাসন) মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, ‘প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদগুলোর জন্য মেধাভিত্তিক কোটা হবে ৪৫ শতাংশ এবং জেলাভিত্তিক কোটা হবে ৫৫ শতাংশ। এই জেলাভিত্তিক কোটা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ শতাংশ, মহিলাদের ১০ শতাংশ ও উপ-জাতীয়দের জন্য পাঁচ শতাংশ পদ সমন্বয় করতে হবে।’
১৯৯০ সালে নন-গেজেটেড পদগুলোর নিয়োগে কোটা পদ্ধতিতে আংশিক পরিবর্তন আনা হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে তা অপরিবর্তিত থাকে। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৯৯৭ সালে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।
১৯৮৫ সালের কোটা বণ্টন অপরিবর্তিত রেখে কেবল ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ‘উপযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী পাওয়া না গেলে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যার জন্য’ তা বরাদ্দের আদেশ জারি করা হয়। এর কিছুদিন পর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কোটার পরিমাণ অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগ পাচ্ছেন না মর্মেও বেশ কয়েকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এ সময় নির্দেশনা না মানলে ‘সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’ বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। তবে ২০০২ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে আরেকটি পরিপত্র জারি করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ কোটা বণ্টনের বিষয়ে আগের জারি করা পরিপত্রগুলো বাতিল করা হয়।
এতে বলা হয়, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত ৩০ শতাংশ কোটা অন্য প্রার্থী দ্বারা পূরণ না করে সংরক্ষণ করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা সংশোধনক্রমে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, ২১ তম বিসিএস পরীক্ষা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত ৩০ শতাংশ কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে উক্ত কোটার শূন্যপদগুলো (ক্যাডার ও নন-ক্যাডার) মেধাভিত্তিক তালিকায় শীর্ষে অবস্থানকারী প্রার্থীদেরকে দিয়ে পূরণ করা যেতে পারে।’
অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৩০ শতাংশে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা তালিকার প্রার্থী থেকে নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করলে এই নির্দেশনাও বাতিল করা হয়। একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য নির্ধারিত কোটা পূরণ করা সম্ভব না হলে পদ খালি রাখার নির্দেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়।
কোটায় পরবর্তী পরিবর্তন আসে ২০১১ সালে। এ সময় মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদেরও ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ ২০১২ সালে এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা যুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
আর এখন জেলা, নারী ও মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতি কোটা নেই।