২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে এক নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) এর তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ (প্রতিবেদনে ‘মার্চ অন ঢাকা’ হিসেবে উল্লেখ) কর্মসূচি ঠেকাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ আগস্ট দুই দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। এই বৈঠকগুলোতে কর্মসূচি মোকাবিলার পরিকল্পনা করা হয়। কোটা আন্দোলনের নেতাদের প্রকাশ্য ঘোষণা এবং গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানতে পারে যে, আন্দোলনকারীরা ৫ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রস্থলে একটি বড় প্রতিবাদ মিছিলের পরিকল্পনা করছে।
৩ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া
৩ আগস্ট সেনাপ্রধানের সাথে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হয়। সেখানে তরুণ কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে বা কোনো ধরনের দমনপীড়ন চালাতে তীব্র আপত্তি জানান। এই বৈঠকের কার্যতই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় সেনাবাহিনী ।
৪ আগস্টের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকসমূহ
৪ আগস্ট সকালে শেখ হাসিনা জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এই বৈঠকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ ও পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও অংশ নেন। বৈঠকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ প্রতিরোধে কারফিউ জারি ও তা বলবৎ রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনির্দিষ্টকালের কঠোর কারফিউ ঘোষণা করে এবং প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে তাদের শক্ত হাতে দমনের আহ্বান জানান।
একই দিন সন্ধ্যায় গণভবনে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসার-ভিডিপির প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল অংশ নেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভকারীদের ঢাকার কেন্দ্রস্থলে প্রবেশে বাধা দিতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হবে। পরিকল্পনা ছিল, সেনাবাহিনী ও বিজিবি রাজধানীর প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করবে এবং পুলিশ ছাত্র জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।
৫ আগস্ট: পরিকল্পনার ব্যত্যয় এবং ক্ষমতার পরিবর্তন
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের তৎকালীন মহাপরিচালক বিজিবির মহাপরিচালককে হোয়াটসঅ্যাপে দুটি বার্তা পাঠান। এর মধ্যে একটি ছিল আন্দোলনকারীদের প্রচারিত বার্তা এবং অন্যটি ছিল প্রতিরক্ষা আদেশের রূপরেখা সংবলিত একটি ভিডিও।
তবে, ৫ আগস্ট সকালে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত ভূমিকা পালন করেননি। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনী যে বাহিনী মোতায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা মোতায়ন করেনি। আরেকজন কর্মকর্তা জানান, বিজিবি প্রতি ঘণ্টায় বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার বিক্ষোভকারীকে ঢাকায় ঢুকতে দিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী দিয়ে শত শত বিক্ষোভকারী সেনাবাহিনীর কোনো বাধা ছাড়াই ঢাকার কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে জানান যে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না।
অন্যদিকে, এই সময়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি চালাচ্ছিল। পুলিশের একজন কমান্ডারের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই সেনাবাহিনী জানতো শেখ হাসিনার পতন হবে। কিন্তু পুলিশ এই তথ্য জানতো না, তাই তারা তখনও সরকারকে রক্ষা করতে সর্বাত্মকভাবে মাঠে ছিল। এই তথ্যগুলো ৫ আগস্টের ঘটনার জটিলতা এবং সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানে ঘাটতি বা ভিন্ন ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রতিবেদনটি ৫ আগস্টের ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ক্ষমতার পালাবদল এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কার্যক্রমের ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।