সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সবচেয় বেশি ঘুষ দেওয়ার প্রবণতা নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলার মানুষদের। সেইসঙ্গে আয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে ধনী জনগোষ্ঠীই তুলনামূলকভাবে বেশি ঘুষ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫–এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনে জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিএস।
জরিপ অনুযায়ী, গত ১২ মাসে যারা সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাদের মধ্যে জাতীয়ভাবে গড়ে ৩১.৬৭ শতাংশ ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে জেলা পর্যায়ে এই হার অনেক ক্ষেত্রে গড়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এক্ষেত্রে শীর্ষে নোয়াখালী, এখানে সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগকারী নাগরিকদের ৫৭.১৭ শতাংশ ঘুষ দিয়েছেন। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে কুমিল্লা (৫৩.৪৭ শতাংশ)। এরপর ফরিদপুর (৫১.৭০ শতাংশ), ভোলা (৪৯.০১ শতাংশ) ও সিরাজগঞ্জ (৪৮.৩৭ শতাংশ)। এসব জেলায় ঘুষ দেওয়ার হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কম ঘুষ দেওয়া জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এই জেলার হার ১০.৪৯ শতাংশ। এরপর মাগুরা ১৩.৯৮ শতাংশ, লালমনিরহাট ১৪.৫০ শতাংশ, গাজীপুর ১৫.২৪ শতাংশ ও সিলেট ১৫.৬১ শতাংশ। এই পাঁচ জেলায় ঘুষ দেওয়ার হার জাতীয় গড়ের অনেক নিচে।
আয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ আরও ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে এনেছে। জরিপে দেখা যায়, সবচেয়ে ধনী শ্রেণির ৩৫.১৬ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণিতে এই হার ২৫.৯২ শতাংশ। মধ্যম আয়ের ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার হার ৩২.২৪ শতাংশ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের ক্ষেত্রে ৩৩.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুষ দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।
এই তথ্য সাধারণ ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রচলিতভাবে মনে করা হয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীই বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বিবিএসের জরিপ বলছে, উচ্চ আয়ের মানুষ সরকারি কাজ দ্রুত করাতে বা সুবিধা নিশ্চিত করতে তুলনামূলকভাবে বেশি ঘুষ দিচ্ছেন অথবা তাদের কাছ থেকেই বেশি ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। ফলে দুর্নীতি কেবল দারিদ্র্যজনিত সমস্যা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আচরণগত সংকট হিসেবেই স্পষ্ট হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে দেশের ৬৪ জেলার ৪৫ হাজার ৮৮৮টি খানা থেকে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ৮৪ হাজার ৮০৭ জন নারী–পুরুষ এই জরিপে অংশ নেন। নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও বৈষম্য—এসডিজি ১৬–এর ছয়টি লক্ষ্যের অগ্রগতি মূল্যায়নে এই জরিপ পরিচালিত হয়।
এ সময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী।