জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ থেকে পদত্যাগ করেছেন কমিশনের খণ্ডকালীন সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধ্যাপক মো. মাকছুদুর রহমান সরকার। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো ও সুপারিশমালা চূড়ান্ত রিপোর্টে গুরুত্ব না পাওয়ায় পদত্যাগ করেন তিনি। মো. মাকছুদুর রহমান সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ঢাবির রেজিস্টার অফিসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ঘোষণা দেন। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
তিনি জানান, ১৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত একটি সভায় মাননীয় অর্থ উপদেষ্টার মৌখিক নির্দেশ এবং বেতন কমিশনের সম্মানিত চেয়ারম্যানের লিখিত নির্দেশনার আলোকে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি সাবকমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিকে তিনটি নির্দিষ্ট কার্যপরিধির (টার্মস অব রেফারেন্স) আওতায় সুপারিশমালা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
মো. মাকছুদুর রহমান বলেন, সাবকমিটি বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য ও ন্যায়সংগত মোট ৩৩টি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে এবং ধাপে ধাপে এগুলো বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। প্রতিটি প্রস্তাবনার সঙ্গে বিস্তারিত যুক্তিকরণ ও ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হয়েছিল। অধিকাংশ প্রস্তাবনায় বেতন-ভাতাকে কাজের মান ও পারফরম্যান্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছিল। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সাবকমিটির প্রতিবেদনটি পৃথকভাবে এজেন্ডাভুক্ত করে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সভায় আলোচনার অনুরোধ করলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, গত ৮ জানুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত কমিশনের সর্বশেষ সভায় একটি মোটামুটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ দেখার পর তার কাছে প্রতীয়মান হয় যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি, যা দেশের উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে তিনি মনে করেন। এ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে কার্যকর কোনো অবদান রাখতে না পারায় তিনি কমিশন থেকে পদত্যাগ করাকেই শ্রেয় মনে করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন একটি শ্রেণিবদ্ধ (ক্লাসিফায়েড) নথি হওয়ায় তিনি পুরো প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করবেন না, তবে গণমাধ্যমের বোঝার সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেবেন। তিনি উল্লেখ করেন, সাবকমিটি চেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও উদ্ভাবনের (রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন) কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এবং এর সঙ্গে সরাসরি প্রণোদনামূলক (ইনসেন্টিভ) ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপন করতে।
তিনি জানান, ৩৩টি প্রস্তাবনার মধ্যে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সামগ্রিক উচ্চশিক্ষাকে মাথায় রেখে নানা সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে টারশিয়ারি পর্যায়ে কলেজগুলোর অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের জন্য তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কারণ বর্তমানে তারা চতুর্থ গ্রেডের ওপরে যেতে পারেন না। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের পে কমিশনে এক ধাপ ওপরে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটি রহিত করা হয়েছে, যা শিক্ষকদের জন্য বঞ্চনার সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী ও টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যাতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্বল্প সম্মানীর বিনিময়ে গবেষণায় যুক্ত হতে পারে এবং দেশে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্কলারশিপ ও এন্ডাওমেন্ট ফান্ডের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যাতে মূল অর্থ অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতায় শিক্ষার্থীদের সহায়তা দিতে পারে।
তিনি জানান, ৩৩টি প্রস্তাবনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৮ থেকে ৯টি প্রস্তাবনায় সরকারের কোনো অতিরিক্ত অর্থব্যয়ের প্রয়োজন হতো না, বরং এগুলো বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেত। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের আগে গ্রেড-১ এ থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ‘সিলেকশন গ্রেড প্রফেসর’ মর্যাদা দেওয়া হতো, যা ২০১৫ সালের পে কমিশনে তুলে নেওয়া হয়। সাবকমিটি প্রস্তাব করেছিল যে গ্রেড-১ এ উন্নীত অধ্যাপকদের ‘সিনিয়র অধ্যাপক’ মর্যাদা দেওয়া হোক, যেখানে সরকারের এক টাকাও অতিরিক্ত ব্যয় হতো না, কিন্তু কমিশন সেটিও আমলে নেয়নি।
তিনি বলেন, পে কমিশনের টার্মস অব রেফারেন্সের প্রথম দিকেই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য প্রণোদনার কথা বলা ছিল, কিন্তু সেই অনুযায়ী কার্যকর সুপারিশ আসেনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৫ সালের পে কমিশনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রভাষকদের এন্ট্রি লেভেল অষ্টম গ্রেড করার সুপারিশ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। একইভাবে অধ্যাপকদের দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত করার সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি, যার ফলে সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন কাঠামো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভিন্ন। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশভুক্ত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো আলাদা, অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো আলাদা এবং কিছু বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো আরও ভিন্ন। তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কোনো অটো-প্রমোশন নেই; প্রতিটি পদে আলাদাভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ হয়। ফলে ভাতা ও অন্যান্য কাঠামো এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল।
তিনি জানান, ৮ জানুয়ারির সভায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর তিনি দেখতে পান যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। তখনই তিনি সভায় তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিমত (নোট অব ডিসেন্ট) দেন, যদিও সভার শুরুতে উপস্থিতি হিসেবে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।
পে কমিশনের কার্যপরিধি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সরকারি ব্যাংক ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন খাতের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ‘অন্যান্য সুবিধা’ পর্যালোচনার সুযোগ কমিশনকে একটি বিস্তৃত বিবেচনামূলক ক্ষমতা দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন, যা কাজে লাগালে একবিংশ শতাব্দীর চাহিদা অনুযায়ী বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেওয়া সম্ভব ছিল।
সবশেষে তিনি বলেন, অতীতে বহু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবারও শুধু সুপারিশ আকারে বিষয়গুলো থাকলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত পরিবর্তন হবে না। এ কারণেই তিনি কমিশনে থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় পদত্যাগ করেছেন।